আগামী ১১ই এপ্রিল ইদ–উল ফিতর। এক মাস সিয়াম সাধনার পর ইদ হলো মুসলমানদের আনন্দের দিন। আর এই আনন্দের অন্যতম আকর্ষণ হলো নাড়ির টানে পরিবারের সবার সঙ্গে ইদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে নিজের গ্রামের বাড়ির পথে ছুটে চলা।
ইদের যাত্রাপথে, বিশেষ করে যারা দূর–দূরান্তে যায়, তাদের রাস্তা–ঘাটে পোহাতে হয় অনেক দুর্ভোগ আর বিড়ম্বনা। তারপরও বাড়িতে ফেরার আনন্দে মন থাকে মাতোয়ারা। তাই কষ্টগুলো আর বড় হয়ে ওঠে না। এই সময়টাতে অনেককেই ভ্রমণ করতে হয় বাস, ট্রেন, লঞ্চ অথবা বিমানে।
যাত্রার পথে রাস্তায় যানজট, ফেরি স্বল্পতা ও পারাপারের সঙ্কট, ট্রেন ,লঞ্চে গাদাগাদি–ঠাসাঠাসি। প্রচণ্ড ভিড় আর ঠেলাঠেলি করে ক্লান্তিকর ও দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে বাড়ি পৌঁছাতে হয়, আবার ছুটি শেষে কাজে যোগদান করতে হয়। সবাই চায় নির্বিঘ্নে আর নিরাপদে ঘরে ফিরতে। তবে যাওয়া আসার ব্যাপারে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। শিশু ও বয়স্কদের পক্ষে লম্বা যাত্রা পথের ধকল সহ্য করা খুব কঠিন হয় বৈকি।
ইদ মৌসুমে যাত্রা পথে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। অন্যথায় পুরো ইদের আনন্দ আগেভাগেই মাটি হয়ে যেতে পারে। তাই ইদ ভ্রমণে অসুস্থ হয়ে পড়াটা কোনক্রমেই কাম্য নয়। তাই এ বিষয়ে সকলের সচেতন থাকা উচিত। যাত্রা শুরুর আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। ব্যাগের মধ্যে কম জিনিসপত্র নেয়া ভালো, যা সহজে বহন করা সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে, প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিতে যেন ভুল না হয়।
ইদ মৌসুমে যাত্রা পথে কিছু প্রয়োজনীয় এবং আবশ্যকীয় টিপস:
যাত্রাপথে পরিধেয় পোশাক ভ্রমণের সময় হালকা, আরামদায়ক ও সহজে বাতাস চলাচল করতে পারে এমন পোশাক পরা উচিত ছোট বড় সবার, বিশেষ করে বাচ্চাদের তো পরাতেই হবে আরামদায়ক জামাকাপড় । টাইট কাপড়–চোপড় পরিহার করাই ভাল। এতে ভ্রমণ হয়ে উঠবে আরামদায়ক।
যাত্রাপথে নরম জুতা বা স্যান্ডেল পরা উচিত। আবার একেবারে নতুন জুতা পরে কোথাও রওনা হবেন না, এতে পায়ে ফোস্কা পড়তে পারে। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য হাইহিল পরিহার করে ফ্লাট স্যান্ডেল পরা উচিত।
যাত্রাপথে খাওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি শতার্কতা অবলম্বন করতে হবে। খাবার ও পানির ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, বাইরের খাবার কোনো ভাবেই গ্রহণ করা ঠিকহবে না। ঘরের তৈরি খাবার ও পানির বোতল সঙ্গে নেয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী নিজে পানি পান করুন এবং বাচ্চাদেরও পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করাবেন। ভ্রমণে খাদ্য ওপানিবাহিত রোগ প্রতিরোধের ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে সবচেয়ে বেশি।
যার যার প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ফার্স্ট এইড বক্স ইদের সময় জরুরী ও প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রসহ ফার্স্ট এইড বক্স নেয়া উচিত। কারণ, গ্রাম এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক সময় প্রয়োজনীয় ঔষধ পাওয়া যায় না। জ্বর, মাথা বা শরীর ব্যথার জন্য নরমাল প্যারাসিটামল, পেটের পীড়ার জন্য মেট্রোনিডাজল, পেটে গ্যাস, পেট ফাঁপা, বুক জ্বলার জন্য এন্টাসিড, রেনিটিডিন, সাধারণ সর্দিকাশির জন্য এন্টি–হিস্টামিন, ডায়রিয়ার জন্য ওরাল স্যালাইন ইত্যাদি সঙ্গে রাখুন ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী । এছাড়া তুলা, গজ, ব্যান্ডেজ, স্যাভলন ইত্যাদি সংগ্রহে রাখুন।হাত কেটে গেলে কিংবা শিশুরা খেলতে গিয়ে শরীরের কোন অংশ কেটে গেলে এগুলো সহায়ক হবে।
নিজের ডায়রিতে আপনার পরিচিত চিকিৎসক ও স্থানীয় হাসপাতালের জরুরী বিভাগের ফোন নম্বর ও ঠিকানা লিখে রাখলে ভাল হয়। যারা বিভিন্ন রোগে ভোগেন, যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, তারা অবশ্যই ইদ ভ্রমণে প্রয়োজনীয় ওষুধ নিতে ভুলবেন না।
কারও কারও বাসে বা যানবাহনে উঠলে মাথা ঘোরা, বমিবমি ভাব এমনকি বমি হয়, যাকে বলে ভ্রমণজনিত মোশন সিকনেস। এ সমস্যা প্রতিরোধে স্টিমেটিল বা ভার্গন ট্যাবলেট ভ্রমণের আধা ঘণ্টা আগে খেয়ে নেবেন। এছাড়া বাস বা ট্রেন চলাকালে বাইরের দিকে তাকিয়ে না থেকে চোখ বন্ধ রাখুন, ঘুমিয়েও নিতে পারেন। যাত্রাপথে অনেকে বই পড়ে সময় কাটান। এই অভ্যাসটা ভাল, কিন্তু যারা মোশন সিকনেসে ভোগেন, তারা ভ্রমণের সময় বইপড়া পরিহার করুন। কারণ, যানবাহনের দুলনির সঙ্গে সঙ্গে বই পড়ার ফলে মাথা ঘোরা শুরু হতে পারে, বমিও হতে পারে।
শিশুদের ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা ট্রেনে, বাসে কিংবা লঞ্চে ভ্রমণের সময়ে শিশুরা সব সময়েই জানালার ধারের সিটটি পছন্দ করে। এ কারণে হঠাৎ করে অতিরিক্ত বাতাসের মুখোমুখি হয়। ফলে শিশুরা অনেকে ঠিক ভ্রমণের পরপরই আক্রান্ত হয় সর্দি–জ্বর কিংবা সাধারণ কাশিতে। এছাড়া বাইরের পানীয় এবং খাবার খেয়ে বমি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। তাই তারা যাতে যাত্রাপথে বাইরের খাবার না খায়, সে ব্যাপারে সজাগ থাকুন।
মনে রাখা উচিত একেবারে ছোট দুগ্ধপোষ্য শিশু নিয়ে ভ্রমণ না করাই উচিত। তবে একান্ত প্রয়োজনে তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করে নিতে হবে। চলার পথে শিশুকে অবশ্যই ধরে রাখবেন, ট্রেন, বাস বা লঞ্চ থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কিন্তু উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়।
বয়স্কদের জন্যও সতর্কতা দীর্ঘ ভ্রমণ বয়স্কদের জন্য বেশি কষ্টসাধ্য। বিভিন্ন রোগসহ অনেকেইবাত–জ্বর বা আর্থ্রাইটিস রোগে ভোগেন। তাদের জন্য বাসে বা ট্রেনে উঠাও সহজ নয়। উঠার সময় তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। যাত্রাপথে যেন তারা একই ভঙ্গিতে বেশি ক্ষণ বসে না থাকে এবং মাঝেমধ্যে যানবাহনের মধ্যেই যেন কিছুক্ষণ চলাফেরা করে, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখুন। তা নাহলে বাতের ব্যথা বাড়তে পারে, এমনকি পায়ে পানি জমে পা ফুলেও যেতে পারে।
মহিলাদের গর্ভাবস্থায় ভ্রমণে করণীয়:
গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ঝাকি হয় এমন পথে ভ্রমণ যথাসম্ভব পরিহার করুন। প্রথম তিন মাস ও সম্ভাব্য ডেলিভারির ২ থেকে ৩ মাস আগে ভ্রমণ এড়িয়ে চলাই ভাল। গর্ভাবস্থায় কোন ক্রমেই একা ভ্রমণ না করা উচিত। নিরাপদ মাতৃত্বের স্বার্থে কোন ধরনের বিপদের ঝুঁকি নেবেন না।
রোজা অবস্থায় ভ্রমণ:
রোজা রেখে রওনা হলে অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে খাবার এবং পানীয় সঙ্গে রাখুন, যেন ইফতারের সময় বাইরের খাবার খেতে না হয়।
যে কয়েকদিন গ্রামে থাকবেন অনেকদিন পর শহর থেকে গ্রামে গেলে স্বাস্থ্যের উপর কিছুটা প্রভাব পড়তেও পারে। রোদে বেশি ঘোরাফেরা করবেন না। প্রয়োজনে ছাতা বা ক্যাপ ব্যবহার করুন।
বাচ্চাদের দিকে বেশি নজর রাখবেন। অনেক বাচ্চাই গ্রামের পশু–পাখি, গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি ইত্যাদির গায়ে হাত দিতে চায়। তাদের এসব থেকে বিরত রাখতে হবে। ছুঁয়ে ফেললে ভাল করে হাত ধুয়ে দিতে হবে।
পুকুর বা জলাশয়ের পানিতে বাচ্চারা যেন একা একা না নামে। রাতে ঘুমানোর সময় মশার কামড় থেকে রক্ষা পেতে মশারি ব্যবহার করতে হবে।
যাত্রা শুরুর আগে সুন্দরভাবে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়ে রওনা হবেন। একটু সতর্ক হলেই প্রতিরোধযোগ্য অসুখ-বিসুখ সহজে এড়ানো সম্ভব। ইদ অবশ্যই খুশি আর আনন্দের, যাত্রা নিরাপদ হলেই প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ইদ হয়ে উঠবে আরও আনন্দময়।
সবাই সুন্দর ভাবে ইদের ছুটি পরিবারের সাথে কাটান। সবাইকে ইদের শুভেচ্ছা।
ডাঃ সেলিনা খাতুন
গাইনোকোলজিস্ট।