দেশের পুঁজিবাজারে ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানির তালিকাভুক্তির সুযোগ বাড়ানো, দুর্বল কোম্পানির ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা জোরদার, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ প্রেরণ সহজ করা এবং আধুনিক আর্থিক পণ্য চালুর পথে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে কমিশনের ১০২৭তম সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা শেষে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
কমিশন সভায় শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট চারটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে সরাসরি তালিকাভুক্তির বিধিমালার খসড়া অনুমোদন, ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানির স্পন্সর ও পরিচালকদের ক্ষেত্রে কঠোরতা, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ প্রেরণে সময়সীমা নির্ধারণ এবং ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন।
১. আইপিও ছাড়াই শেয়ারবাজারে আসার সুযোগ
ভালো ও বড় কোম্পানিকে দ্রুত পুঁজিবাজারে আনতে ‘Bangladesh Securities and Exchange Commission (Direct Listing of Securities by Stock Exchange) Rules, 2026’-এর খসড়া অনুমোদন করেছে কমিশন।
বিএসইসি জানিয়েছে, খসড়াটি জনমত যাচাইয়ের জন্য শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।
প্রস্তাবিত বিধিমালা কার্যকর হলে নির্দিষ্ট যোগ্যতার কোম্পানিগুলো প্রচলিত আইপিও প্রক্রিয়া ছাড়াই সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানাধীন শেয়ারের নির্ধারিত অংশ অফলোডের মাধ্যমে এ তালিকাভুক্তির সুযোগ তৈরি হবে।
প্রস্তাবিত কাঠামোর আওতায় সরকারের সম্পূর্ণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন কোম্পানি, পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি, নির্দিষ্ট যোগ্যতার টেলিকম ও আইসিটি অবকাঠামো কোম্পানি, অন্তত পাঁচ বছরের সফল কার্যক্রম পরিচালনাকারী তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং নির্ধারিত আর্থিক সক্ষমতাসম্পন্ন কোম্পানিগুলো সুযোগ পেতে পারে।
বিএসইসির এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো ভালো ও বড় কোম্পানিকে অপেক্ষাকৃত দ্রুত পুঁজিবাজারে নিয়ে আসা এবং বাজারের গভীরতা বাড়ানো।
২. ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানিতে কঠোরতা, খেলাপি হলে শেয়ার বাজেয়াপ্তের বিধান
পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা জোরদার করতে ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানির স্পন্সর ও পরিচালকদের শেয়ার বা সিকিউরিটিজ লেনদেন ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কঠোরতা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
সংশোধিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানির পরিচালক ঋণখেলাপি বা নির্ধারিত নিয়ম ভঙ্গকারী হলে তার শেয়ার বাজেয়াপ্ত (Confiscation) করার বিধান থাকবে।
তবে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের কাছে শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কমিশনের পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন হবে না।
বিএসইসির এ সিদ্ধান্তের লক্ষ্য হলো দুর্বল কোম্পানির পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়বদ্ধতা বাড়ানো এবং বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা।
৩. বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ প্রেরণে ৩০ দিনের সময়সীমা
তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ প্রেরণের প্রক্রিয়া সহজ করতে নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করেছে বিএসইসি।
কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ঘোষিত লভ্যাংশ প্রেরণের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) থেকে Double Taxation Avoidance (DTA) Certificate পাওয়ার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে লভ্যাংশ প্রেরণ করতে হবে।
লভ্যাংশ বিতরণের পর সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ‘Preliminary Dividend Compliance Report’ দাখিল করতে হবে। একই সঙ্গে চূড়ান্ত লভ্যাংশ প্রেরণের ৩০ দিনের মধ্যে ‘Dividend Compliance Report’ কমিশন ও সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দিতে হবে।
বিএসইসির এ উদ্যোগ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমানোর পাশাপাশি বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
৪. জানুয়ারি ২০২৭-এ শুরু হতে পারে ডেরিভেটিভস মার্কেট
দেশের পুঁজিবাজারে আধুনিক আর্থিক পণ্য চালুর অংশ হিসেবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃক দাখিল করা Financial Derivatives চালুর কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করেছে বিএসইসি।
এ কর্মপরিকল্পনার আওতায় প্রয়োজনীয় রেগুলেটরি উদ্যোগ, ট্রেডিং সিস্টেম উন্নয়ন, ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রাথমিকভাবে ‘Index Futures’ দিয়ে ডেরিভেটিভস ট্রেডিং চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ফাইন্যান্সিয়াল ডেরিভেটিভস পণ্যের আনুষ্ঠানিক লেনদেন শুরু হতে পারে।
শেয়ারবাজারে সংস্কারের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
বিএসইসির ১০২৭তম কমিশন সভার সিদ্ধান্তগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একদিকে ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিকে দ্রুত বাজারে আনার পথ তৈরি করা হচ্ছে, অন্যদিকে দুর্বল কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ প্রেরণের সময়সীমা নির্ধারণ এবং ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর উদ্যোগ দেশের পুঁজিবাজারকে আরও আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় করার পরিকল্পনার অংশ।
তবে এসব সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, যোগ্য কোম্পানি নির্বাচন, শক্তিশালী নজরদারি এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার ওপর।
বিএসইসির নেওয়া চারটি সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সুযোগ, পণ্যের বৈচিত্র্য, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সুবিধা এবং বাজার শৃঙ্খলা, চার ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।