আলোচিত ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্যে উল্লেখযোগ্য তেমন কোন বিশেষ প্রণোদনা নেই। গত এক মাসের বেশি সময় ধরে শেয়ারবাজারে ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স (মূলধনি মুনাফা) ইস্যুতে শেয়ারবাজারের মন্দা যেন পিছুই ছাড়ছেনা। তবে ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স (মূলধনি মুনাফা) ইস্যু নিয়ে যে আতংক ছিল সেই বিষয়টির সুরাহা হয়েছে।
এইবারের বাজেটে শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট যে সব নির্দেশনা সমূহ এসেছে সেগুলো নিম্নরূপ।
৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্যাপিটাল গেইন করমুক্ত
বাজেটে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী নতুন করে মূলধনি মুনাফার ওপর করারোপের এ প্রস্তাব করেছেন। যদিও বাজেটের আগে থেকেই শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দাবি ছিল, ব্যক্তি শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে নতুন করে যেন করারোপ করা না হয়। কিন্তু সেই দাবি শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়নি।
অর্থমন্ত্রী বাজেটে প্রস্তাব করেছেন, ব্যক্তি শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত মূলধনি মুনাফায় কোনো কর বসবে না। তবে ৫০ লাখ টাকার বেশি মুনাফা করলে তার ওপর কর দিতে হবে।
ধরা যাক, আপনি সেকেন্ডারি বাজারে শেয়ার লেনদেন করে এক বছরে ৬০ লাখ টাকা মুনাফা করেলেন সে ক্ষেত্রে মুনাফার ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধার আওতায় থাকবে। বাকি ১০ লাখ টাকা মুনাফা আপনার মোট আয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। তাতে আপনার নির্দিষ্ট একটি অর্থবছরে মোট আয়ের ওপর যে হারে কর প্রযোজ্য হবে, সেই হারে কর দিতে হবে। তবে আপনি যদি কোনো শেয়ার একটানা ৫ বছর ধরে রেখে ৫০ লাখ টাকার বেশি মুনাফা করেন, সে ক্ষেত্রে ওই মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে করারোপ হবে।
এছাড়া ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীর বাইরে কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে যে মুনাফায় করুক, সেই মুনাফার ওপর করারোপ হবে।
শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ৯০ শতাংশই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। তাদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন কোম্পানির উদ্যোক্তা–পরিচালক, প্লেসমেন্ট শেয়ারধারী, স্টক ব্রোকার, ডিলার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সবাই মূলধনি মুনাফার ওপর সর্বনিম্ন ৫ থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হারে কর দেন। মূলধনি মুনাফার ওপরকর দেন না শুধু ব্যক্তিশ্রেণির সাধারণ বিনিয়োগকারীরা, যা শেয়ারবাজারের মোট বিনিয়োগকারীর মাত্র ১০ শতাংশ।
মূলধনি মুনাফার ওপর করারোপের বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে বিষয়টি আলোচনায় আসে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলন করে এই করারোপ না করার দাবি জানায়। তবে শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট সেই দাবি শেষ পর্যন্ত রাখেননি অর্থমন্ত্রী।
কালো টাকা বিনিয়োগ
২০২৪–২৫ অর্থবছরের বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ অন্যসব খাতের ন্যায় শেয়ারবাজারেও বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে স্থাবর সম্পত্তি যেমন- ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট ও ভূমির জন্য নির্দিষ্ট কর এবং নগদসহ অন্যান্য পরিসম্পদের ওপর ১৫ শতাংশ কর পরিশোধ করে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। দেশের প্রচলিত আইনে যাই থাকুক না কেন- এ ক্ষেত্রে কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের প্রশ্ন তুলতে পারবে না। অর্থাৎ এবার বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে।
তথ্য প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের কর অব্যাহতি
তিন বছরের জন্য কর অব্যাহতি পেল দেশের তথ্য প্রযুক্তি (আইসিটি) খাত। তবে বর্তমানে এই খাতের ২৭টি উপখাতে কর অব্যাহতির সুবিধা থাকলেও সেই সুবিধা কিছুটা কমে ২০টি খাতে নেমে আসতে পারে।
সংসদে অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রস্তাবনায় বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের সহায়ক হিসেবে আমি কোনো নিবাসী ব্যক্তি বা অনিবাসী বাংলাদেশি স্বাভাবিক ব্যক্তির নিম্নবর্ণিত ব্যবসা থেকে উদ্ভূত আয়, ওই ব্যক্তির সব ব্যবসায়িক কার্যক্রম ক্যাশলেস হওয়ার শর্তে তিন বছর করমুক্ত করার প্রস্তাব করছি।
খাতগুলো হলো— এআই বেজড্ সলিউশন ডেভেলপমেন্ট, ব্লকচেইন বেজড্ সলিউশন ডেভেলপমেন্ট, রোবোটিক্স প্রসেস আউটসোর্সিং, সফটওয়্যার অ্যাজ আ সার্ভিস, সাইবার সিকিউরিটি সার্ভিস, ডিজিটাল ডেটা অ্যানালাইটিক্স ও ডেটা সায়েন্স, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট সার্ভিস, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও কাস্টমাইজেশন, সফটওয়্যার টেস্ট ল্যাব সার্ভিস, ওয়েব লিস্টিং, ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট ও সার্ভিস, আইটি সহায়তা ও সফটওয়্যার মেইনটেন্যান্স সার্ভিস, জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিস, ডিজিটাল অ্যানিমেশন ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল ডেটা এন্ট্রি ও প্রসেসিং, ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ও ই-পাবলিকেশন, আইটি ফ্রিল্যান্সিং, কল সেন্টার সার্ভিস, ডকুমেন্ট কনভারশন এবং ইমেজিং ও ডিজিটাল আর্কাইভিং।
তথ্য প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে তিন বছরের জন্য কর অব্যাহতি পাওয়ায় কিছুটা লাভবান হবে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আইটি খাতের কোম্পানিগুলি।
শেয়ার হস্তান্তরে দিতে হবে ১০ শতাংশ কর
শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি বা তহবিলের সিকিউরিটিজ বা শেয়ার হস্তান্তরের জন্য ১০ শতাংশ হারে কর প্রদান করতে হবে। অর্থ আইন ২০২৪- এর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
শেয়ার হস্তান্তর প্রসঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটে উল্লেখ রয়েছে, স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি বা তহবিলের সিকিউরিটিজ হস্তান্তরের জন্য কর প্রদান করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কর্তৃক হস্তান্তরের সম্মতি বা অনুমোদন প্রদানের দিনে শেয়ারের সমাপনী মূল্য বা সর্বশেষ লেনদেনের সমাপনী মূল্যের ওপর ভিত্তি করে ১০ শতাংশ হারে কর আরোপিত হবে। তবে মাতা-পিতা, সন্তান এবং স্বামী- স্ত্রীর মাঝে উপহার হিসেবে শেয়ার বিনিময়ে এ কর আরোপিত হবে না।
তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির কর হারের ব্যবধান
নতুন বাজেটে শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তি উৎসাহিত করতে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করহারের ব্যবধান বাড়ানোরও প্রস্তাব করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হার কমিয়ে সাড়ে ১৭ শতাংশ করার দাবি করেছিল ডিএসই কর্তৃপক্ষ। আর অতালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে তা বাড়িয়ে সাড়ে ৩৭ থেকে ৪০ শতাংশ করার দাবি করা হয়। কিন্তু অর্থমন্ত্রী এই দাবিও আমলে নেননি।সেখানে এই ব্যবধান না বাড়িয়ে উল্টো কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে ঘোষিত বাজেটে। এতে করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহ কমে যেতে পারে কোম্পানিগুলোর।
আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে করপোরেট কর হারে কোনো পরিবর্তন আনেননি অর্থমন্ত্রী। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি যদি তাদের পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার বাজারে ছাড়ে, তাহলে ওই কোম্পানির ক্ষেত্রে শর্ত সাপেক্ষে কর্পোরেট কর আগের মতোই ২০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
শর্ত পূরণ না করলে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে এ করহার হবে সাড়ে ২২ শতাংশ। আর যেসব কোম্পানি পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশের কম শেয়ার বাজারে ছাড়বে, তাদের ক্ষেত্রে শর্ত পরিপালন সাপেক্ষে করপোরেট করহার হবে সাড়ে ২২ শতাংশ। এ ধরনের কোম্পানির ক্ষেত্রে যারা শর্ত পালন করবে না, তাদের ক্ষেত্রে এ করহার হবে ২৫ শতাংশ।
তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে আড়াই শতাংশ কম করপোরেট করের সুবিধা পেতে যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, সেটি হলো যেসব কোম্পানি ৫ লাখ টাকার বেশি একক লেনদেন ও বার্ষিক ৩৬ লাখ টাকার বেশি লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করতে হবে। এ শর্ত পালন না করলে কোম্পানিগুলো কম করপোরেট করের সুবিধা পাবেন না।
মূলধনি মুনাফার ওপর করারোপের উদ্যোগের প্রভাবে বেশ কিছুদিন ধরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করে আসছিল।তবে ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স (মূলধনি মুনাফা) ইস্যু নিয়ে যে আতংক ছিল সেই বিষয়টির সুরাহা হয়েছে।যা বাজারের জন্যে ইতিবাচক দিক।