কোরবানি ( قربانى ), কুরবান বা আযহা ( أضحية) কে ইসলামী আইন হিসাবে উল্লেখ করা হয়, যা ঈদ উল আযহার সময় পশু উৎসর্গের অনুষ্ঠান। ইসলামি মতে কোরবানী হচ্ছে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট ব্যক্তির আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পুরস্কার লাভের আশায় নির্দিষ্ট পশু জবেহ করা বা কোরবান করা। কোরবানি মুসলিম উম্মার একটি পবিত্র, তাৎপর্যপূর্ণ ও ত্যাগের উৎসব।
পবিত্র কোরবানির মাংস দান খয়রাত বা বিলি বন্টন করা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন নির্দেশ নেই। বরং কোরবানির উদ্দেশ্য হল শুধু মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে নিষ্পাপ প্রাণী কোরবানি (জবাই) করা।
সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত ২৮ এ মহান আল্লাহতালা বলেন- ‘যেন তারা নিজদের কল্যাণের স্থানসমূহে হাজির হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু থেকে যে রিজিক দিয়েছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিন সমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে। অতঃপর তোমরা তা থেকে খাও এবং দুস্থ-দরিদ্রকে খেতে দাও’।
আল্লাহতা‘আলা বলেন, (فَكُلُوْا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ) ‘অতঃপর তোমরা তা হতে আহার কর এবং আহার করাও, ধৈর্যশীল অভাব গ্রস্তকে ও বিনয়ের সাথে ভিক্ষাকারীকে।’ এখান থেকে অনেকে দলীল গ্রহণ করেন যে, কুরবানীর গোশত তিন ভাগে করতে হবে। একভাগ নিজের জন্য, দ্বিতীয় ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং তৃতীয় ভাগ ফকির-মিসকীনদের জন্য। অথচ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এরূপ কোন নির্দেশই জারী করে দেননি।
যেমন হাদীসে বলা হয়েছে- রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন- আমি তোমাদের তিন দিনের বেশি কুরবানীর গোশত রাখতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমাদেরকে অনুমতি দিচ্ছি তোমরা খাও, প্রয়োজন মত জমা রাখো।
অন্য বর্ণনায় এসেছেন খাও, সদকা কর এবং জমা রাখো। অন্য আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছেন খাও, খাওয়াও ও সদকা কর। (সহীহ বুখারী হা: ৫৫৬৯, সহীহ মুসলিম হা: ১৯৭১) ইসলামের সূচনালগ্নে তিনদিনের পরে কুরবানীর গোশত খাওয়া সম্বন্ধে যে নিষেধাজ্ঞা অর্পিত হয়েছিল।
তার বর্ণনা এবং তা রহিত হওয়া ও যতদিন ইচ্ছা ততদিন পর্যন্ত খাওয়া বৈধ হওয়ার বর্ণনা সালামাহ্ ইবনু আকওয়া (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি কুরবানী করবে, সে যেন ঈদের তৃতীয় রাতের পর তার বাড়িতে কুরবানীর পশুর কোন কিছু সঞ্চিত না রাখে।
আগামী বছর যখন আগত হলো, তখন লোকজনেরা বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমরা কি গত বছরের মতো করবো? তিনি বললেন, না। সে বছর তো মানুষ খুব দুর্দশায় ছিল, তাই আমি চেয়েছিলাম যাতে সকলের কাছে কুরবানীর (মাংস) পৌঁছে যায়।
কুরবানীর মাংস থেকে কতটুকু খাওয়া যাবে, আর কতটুকু সঞ্চয় করে রাখা যাবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন – তোমাদের যে লোক কুরবানী করেছে, সে যেন তৃতীয় দিনে এমন অবস্থায় সকাল অতিবাহিত না করে যে, তার ঘরে কুরবানীর গোশ্ত কিছু থেকে যায়। পরবর্তী বছর আসলে, সহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তেমন করব? যেমন গত বছর করেছিলাম? তখন তিনি বললেনঃ তোমরা নিজেরা খাও, অন্যকে খাওয়াও এবং সঞ্চয় করে রাখো। কারণ গত বছর মানুষের মধ্যে ছিল অভাব অনটন। তাই আমি চেয়েছিলাম তোমরা তাদের সহযোগিতা কর।
অর্থাৎ, দুর্দশা-অনটনের বছরে অভাবীদের ভেতর কোরবানির মাংস বিলানোর নির্দেশ থাকলেও, অন্যান্য বছরগুলোতে দান করার সুস্পষ্ট হুকুম দেননি নবী। কেউ যদি ইচ্ছা করে তবে দান করতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে কোন বাধ্য বাধকতা নেই। সঠিক মত এই যে, কোন আয়াত বা সহীহ হাদীসে এরূপ ভাগাভাগি করতেই হবে এমনটি প্রমাণ পাওয়া যায় না, তাই কেউ যদি ভাগ নাও করে তাতে সে গুনাহগার হবে না। মূলত দেখা হবে তার অন্তরে কী ছিল। তাই আমাদেরকে প্রথমত আমাদের নিয়ত ঠিক করা একান্ত কর্তব্য, তা না হলে কোন আমলই গ্রহণযোগ্য হবে না।
পরিশেষে সার্বিকভাবে কোরানের আয়াত ও হাদিস এর বর্ণনা অনুযায়ী বিশ্লেষণ করে জানা গেল কেউ যদি কোরবানির মাংস সব রেখে দেয়, সব বন্টন করে, তার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। অল্প মাংস বিতরণ করলে কোরবানি হবেনা মাংস খাওয়া হবে এমন কোন বিষয়ে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। পবিত্র কোরবানির মাংস দান খয়রাত বা বিলি বন্টন করা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন নির্দেশ নেই। তাই আমরা আজ থেকে অন্য মানুষ কোরবানি দেয়া মাংস কি করল এই ব্যাপারে সমালোচনা না করি।
কোরবানির মাংস একবারে কাটায় কাটায় ৩ ভাগ করতেই হবে এমন কোন বিধান নেই। (তবে এই বন্টন নিয়ে সমালোচনা না করাই উত্তম) তবে কোরবানির মাংস আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে ও গরীবদের মাঝে বন্টন করে খাওয়াই উত্তম।
সব কিছু মহান আল্লাহতালাই ভালো জানেন, আল্লাহ আমাদের সবার কোরবানি কবুল করুন।
কোরবানির চামড়া কী করবেন?
কুরবানির চামড়া ব্যবহার করা যাবে আবার দানও করা যাবে। এ সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো।
চামড়ার বিধান কুরবানীর চামড়া সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা কুরবানির পশুর চামড়া দ্বারা উপকৃত হও; তবে বিক্রি করে দিও না’।
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, যে ব্যক্তি কুরবানি করবে, সে কুরবানির চামড়া বা গোশত বিক্রি করে তার মূল্য নিজের কাজেও লাগাতে পারবে না এবং চামড়া ও গোশত দিয়ে কসাইয়ের মজুরিও দিতে পারবে না। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে কুরবানির চামড়া দান করা উত্তম।
তবে কুরবানিদাতা যদি চামড়া ব্যবহার করতে চায়, তবে সে তা ব্যবহার করতে পারবে। তাতে কোনো নিষেধ নাই। আর যদি দান করতে চায় বা বিক্রি করে দেয়, তবে তা গরিব, এতিম মিসকিন ও অসহায়দের দিতে হবে। কুরবানি দাতা নিজে চামড়ার মূল্য খরচ করতে পারবেন না।
কুরবানির চামড়াকে চামড়ার আকারে রেখে প্রক্রিয়াজাত করে কুরবানি দাতা তা ব্যবহার করতে পারবে। ইচ্ছা করলে প্রিয়জনকে তা উপহার হিসেবেও দিতে পারবে। আবার ইচ্ছা করলে তা সাদকাও করতে পারবে।
উল্লেখ্য, আগের যুগে মানুষ পশুর চামড়া দিয়ে নিজে ব্যবহার করার জন্যে বিভিন্ন ভাবে সেটাকে কাজে লাগাতো। আধুনিক যুগে ব্যক্তি পর্যায়ে চামড়া ব্যবহার করেনা, কেননা মানুষ এখন চামড়া দিয়ে তৈরী জিনিসপত্র ক্রয় করতে পারেন, যা আগের যুগে এই ব্যবস্থা ছিলোনা।
প্রকৃত পক্ষে যারা জাকাত, ফিতরা পাওয়ার উপযুক্ত তারাই কুরবানির চামড়ার অর্থ পাওয়ার হকদার। তবে এক্ষেত্রে ইয়াতিম, মিসকিন ও গরিব শিক্ষার্থীকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেয়া যাবে।
দ্বীনের শিক্ষার্থী যদি এতিম বা গরিব হয় তবে তাকে জাকাত, ফিতরা ও কুরবানির চামড়ার মূল্য প্রদানে বেশি ফজিলত রয়েছে।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।