অপরের কি আছে, আমার কি নাই, তার তুলনা করতে করতে আমাদের সকাল, বিকাল, রাত পার হয়ে যায়, অতঃপর আরো একটি দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর কিংবা সম্পূর্ণ জীবনটাই!
বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কবিতায় বলেছেন,
নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস,
ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।
নদীর ওপার বসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে;
কহে, যাহা কিছু সুখ সকলি ওপারে।
সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের বিপরীতে সুখ আছে বলেই ঠুংকো ধারণা আছে।
আপনার সন্তানের বিদ্যায়তনের সহপাঠীর অধ্যয়ন উৎকর্ষে বা প্রথম হবার কারণে আপনার মনঃকষ্ট জমাট বাঁধে থাকে; তাহাকে ‘আন্তরিক’ অভিনন্দন জানালেও আপনার মনের মধ্যে আপনার সন্তান প্রথম না হওয়ায় হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস পুড়িয়ে মারতে থাকে।
আপনার বন্ধু বা সহপাঠীর সহিত অনেক বছর পর আকস্মিক সাক্ষাতে তাহার বর্তমান যশ, অর্থ-কড়ি, বৈভবের গল্প শুনে আপনার মনে যদি আন্তরিক ভালোলাগা না আসে, তা হলে এক্ষুনি নিজের ভেতরকার সেই অপচিন্তাকে দূর করার ব্যবস্থা করুন।
আপনার প্রতিবেশীর বৈষয়িক উন্নতি দেখে আপনি তাহার মত হতে না পারার যে নিষ্পেষণ আপনার মনে বাসা বেঁধেছে, তা আপনাকে কোথায় নিয়ে যাবে, তাহার ইয়ত্তা নাই।
মনের জানালা বড় করুন। ভাবুন, আপনার যা আছে, তা পৃথিবীর কারোই নাই। আপনার হাতের আঙ্গুলের চাপ, আই প্রিন্ট যেমন স্বতন্ত্র, পৃথিবীর সাড়ে ছয়-সাতশত কোটি মানুষের কারো সহিত মিল নাই, তদ্রূপ আপনার মনন-মানসিক শক্তি, বুদ্ধি-ভিত্তিক ঐশ্বর্য, স্বপ্নের বিশালতা, ভাগ্যের পরিধি, অদৃষ্টের স্বর্গীয় লেখন, রিযিক-হায়াত-মাওত সবই একান্ত স্বতন্ত্র, অনন্য ও সুখী।
সৃষ্টিকর্তা আপনার জন্য যা যখন যেভাবে নির্ধারিত করে রেখেছেন, তা যথাসময়ে আপনার কাছে আসবে, কেউ চাইলেও রোধ করতে পারবে না। আর, যা আপনার জন্য নির্ধারিত নয়, তা আপনার কাছে আসবে না।
স্বপ্ন দেখতে গিয়ে, প্রার্থনায় চাইতে গিয়ে সুউচ্চ পর্বত, সূর্যসম আলোকময়তা, আকাশসম বিস্তৃত আশা করে প্রার্থনা করুন, স্বপ্নের পরিধি বাড়ান, কিন্তু না পাইলে তা মেনে নেবার শক্তি রাখুন মনে। বাস্তব সম্মত কামনাই অর্থবহ ও উত্তম।
আর যখন তখন অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করা থেকে বিরত থাকুন। করলে নিচের জনের সহিত তুলনা করুন। ভাবুন, আপনি খুব ধনী না হইলেও পাশের বাড়ির অঙ্গবিহীন পঙ্গু প্রতিবেশীর চেয়ে তো ভালো আছেন, স্বস্তি পেয়ে থাকবেন। আপনার সন্তান তত মেধাবী না হইলেও সুস্থ আছে, নিজ চেষ্টায়ও আছে, তাতে সন্তুষ্টি নিয়ে সামনে এগিয়ে যান।
এ প্লাস পেতেই হবে, এই চাপ দিয়ে পত্রিকায় সেই সব শিরোনাম তৈরি করিবেন না, যেমন ‘এ প্লাস না পাইয়া এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যা’।
শুকরিয়া করুন আপনার প্রাপ্তিতে। এখনও বেঁচে আছেন, সেইটাই বড় শুকরিয়ার বিষয়। চিন্তা করে দেখুন ছোট বেলায় আপনার যে বন্ধু দুর্ঘটনায় বা কঠিন রোগে অকালমৃত্যু বহন করে জীবনে ইতি টেনেছে অনেক আগে, তার চেয়ে বেশি দিন আয়ুষ্কাল পায়ে বেঁচে আছেন, তা কম কিসে?
না পাওয়ার হতাশা আর হৃদরোগ নিয়ে নয়, আশা ভরসা, সন্তুষ্টি আর প্রার্থনা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করুন।
প্রতিটি দিন, প্রতিটি সপ্তাহ, প্রতিটি মাস, প্রতিটি বছরেই প্রতিটি জীবন সাধ্যমত সুন্দর কাটুক পৃথিবীর সকল প্রাণীর। শুভ কামনা পৃথিবীর সকল প্রাণীকুলের জন্য।