দেশের শেয়ারবাজারে আস্থার সংকট ও অস্থিরতা কাটছে না। ভালো-মন্দ নির্বিশেষে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দরপতনে উদ্বেগ বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। বাজারের এমন পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির ধরন, অনুসন্ধানের নীতিমালা এবং বাজারের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, শেয়ারের দাম বাড়লেই অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান করা হলে অস্বাভাবিক দরপতনের পেছনেও কোনো অনিয়ম বা কারসাজি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নজরদারি হতে হবে নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ ও সবার জন্য সমান।
অধিকাংশ শেয়ারে দরপতন, চাপে বিনিয়োগকারীরা
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ১১ অক্টোবরের সর্বশেষ লেনদেনের তথ্য অনুযায়ী, প্রধান সূচক ডিএসইএক্স (DSEX) ২৪.৫৪ পয়েন্ট বা ০.৪৫ শতাংশ কমে ৫,৪৫১.০৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। শরিয়াহভিত্তিক সূচক ডিএসইএস (DSES) ৬.৬৭ পয়েন্ট বা ০.৬১ শতাংশ কমে ১,০৮০.৩১ পয়েন্টে নেমেছে। অন্যদিকে, ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস-৩০ (DS30) ২.২২ পয়েন্ট বা ০.১১ শতাংশ কমে অবস্থান করেছে ২,১০৩.৪৬ পয়েন্টে।
আজ লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৭৯টির শেয়ারদর বেড়েছে, কমেছে ২৬৪টির এবং ৪২টির দর অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ, দরবৃদ্ধির তুলনায় দরপতন হওয়া কোম্পানির সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
আজ ডিএসইতে ১ লাখ ৮৪ হাজার ১৯১টি লেনদেনের মাধ্যমে ১৮ কোটি ৮৮ লাখের বেশি শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এসব লেনদেনের মোট মূল্য ছিল প্রায় ৫৬৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
এর আগের কার্যদিবসে সূচকগুলোতে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও সেই ঊর্ধ্বমুখী ধারা স্থায়ী হয়নি। পুনরায় সূচকের পতন এবং অধিকাংশ শেয়ারের দর কমে যাওয়া বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
দাম বাড়লেই অনুসন্ধান, কমলে নয় কেন?
শেয়ারবাজারে নজরদারির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। কোনো শেয়ারের দাম ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে ৫০ টাকা থেকে ১০ টাকায় নেমে এলেও অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অনুসন্ধানের খবর পাওয়া যায় না। অথচ একই শেয়ারের দাম ১০ টাকা থেকে ১৫ টাকায় বাড়লে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছে কুয়েরি (Query) পাঠানো বা অনুসন্ধানের উদ্যোগ দেখা যায়।
প্রশ্ন হলো, একই শেয়ারের দরবৃদ্ধি ও দরপতনের ক্ষেত্রে নজরদারির দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হবে কেন?
অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির পেছনে কারসাজি বা অনিয়মের আশঙ্কা থাকলে অনুসন্ধান অবশ্যই প্রয়োজন। একইভাবে, অস্বাভাবিক দরপতনের পেছনেও কোনো ধরনের কারসাজি, অসাধু লেনদেন, গুজব ছড়ানো কিংবা কৃত্রিম আতঙ্ক সৃষ্টির ঘটনা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।
কারণ, শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে কমিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত করে কম দামে শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য করার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে কোনো শেয়ারের দরপতন হলেই সেখানে কারসাজি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। যথাযথ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি যাচাই করতে হবে।
চাহিদা-জোগানের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ নয়
শেয়ারবাজারে চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতেই সাধারণত শেয়ারের দাম নির্ধারিত হয়। কোম্পানির আর্থিক পারফরম্যান্স, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, লভ্যাংশ, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও শেয়ারের দামে প্রভাব ফেলে।
তাই শেয়ারের দাম বাড়লেই কিংবা কমলেই সরাসরি হস্তক্ষেপ করার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত, মূল্য পরিবর্তনের পেছনে কোনো অনিয়ম রয়েছে কি না, তা বস্তুনিষ্ঠভাবে যাচাই করা।
অস্বাভাবিক লেনদেন, বাজার কারসাজি, অভ্যন্তরীণ গোপন তথ্যের অপব্যবহার (Insider Trading) কিংবা অন্য কোনো বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে, চাহিদা-জোগানের স্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে দাম ওঠানামা করলে বাজারকে তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় চলতে দেওয়া উচিত।
বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রমে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অনিয়ম প্রতিরোধ ও সুশাসন নিশ্চিত করা, কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম নির্ধারণ করা নয়।
অনুসন্ধানের খবর প্রকাশে সতর্কতা জরুরি
কোনো কোম্পানির কাছে কুয়েরি পাঠানো বা প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কখনো কখনো উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে, অনুসন্ধানের প্রকৃতি ও কারণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে অনেকে বিষয়টিকে সম্ভাব্য অনিয়মের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। এর প্রভাব শেয়ারের দামের ওপরও পড়তে পারে।
এ কারণে অনুসন্ধানের প্রাথমিক পর্যায়ে তথ্য প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি। আইনগত বাধ্যবাধকতা, তালিকাভুক্ত কোম্পানির তথ্য প্রকাশের বিধান এবং বিনিয়োগকারীদের জানার অধিকার অক্ষুণ্ন রেখে যেখানে আইনসম্মত, সেখানে প্রাথমিক অনুসন্ধানের অপ্রয়োজনীয় প্রচার এড়ানো যেতে পারে।
তবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার স্বার্থে প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন রাখা যাবে না। অনুসন্ধান বা তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থাৎ, একদিকে যেমন অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি করা উচিত নয়, অন্যদিকে তেমনি বিনিয়োগকারীদের তথ্য জানার অধিকারও উপেক্ষা করা যাবে না।
আস্থা ফেরাতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ নজরদারি
শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু সূচকের উত্থান-পতন পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট নয়। বাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সুশাসন এবং সবার জন্য সমান নিয়মের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
দাম বাড়লে যেমন অস্বাভাবিকতার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে, তেমনি অস্বাভাবিক দরপতনের ক্ষেত্রেও অনিয়মের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে কোম্পানির মৌলভিত্তি, আর্থিক তথ্য এবং বাজারের প্রকৃত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিটি পদক্ষেপে নিরপেক্ষতা ও ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরির সুযোগ বাড়বে। বিপরীতে, নজরদারির ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যের ধারণা তৈরি হলে বাজার সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব আরও গভীর হতে পারে।
শেয়ারবাজারের মূল শক্তি শুধু সূচকের ঊর্ধ্বমুখী গতি নয়, বিনিয়োগকারীদের আস্থা। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে দরবৃদ্ধি ও দরপতন উভয় ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিয়ে অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা-জোগানের প্রক্রিয়াকে সম্মান জানিয়ে একটি স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।