অর্থ লিপি

৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সোমবার ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

ভালো কোম্পানিকে ঋণ নয়, শেয়ারবাজারে আনুন: ব্যাংক বাঁচবে, অর্থনীতি বাঁচবে

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “অর্থ লিপি.কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  www.facebook.com/OrthoLipi

বাংলাদেশের ঋণখেলাপি সমস্যার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির প্রবণতা এবং ঋণ অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে দায়ী করা হচ্ছে। শুধু খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা নয়, ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়াতেও মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকঋণের বড় একটি অংশ যদি প্রকৃত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে অনুৎপাদনশীল ও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেই ঋণ থেকে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া কঠিন। একই সঙ্গে ঋণের অর্থের ব্যবহার যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ না করা হলে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশে ঋণখেলাপির আলোচনা হলেই সাধারণত ঋণগ্রহীতার দায়ের বিষয়টি সামনে আসে। তবে ঋণ দেওয়ার সময় ব্যাংক প্রকল্পের বাস্তবতা, ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা এবং অর্থের সম্ভাব্য ব্যবহার কতটা যাচাই করেছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পর তা প্রকৃত ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার না করে ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাস, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা অন্যান্য অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। এতে ব্যবসা থেকে পর্যাপ্ত নগদ প্রবাহ তৈরি না হওয়ায় ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও কমে যায়।

ফলে একসময় ঋণটি খেলাপিতে পরিণত হয়। এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতা বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয় এবং পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ আমানতকারী ও সৎ ঋণগ্রহীতারাও।

ঋণ দেওয়ার পদ্ধতিতে পরিবর্তন জরুরি

বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে হলে শুধু খেলাপি হওয়ার পর ব্যবস্থা নিলে হবে না। ঋণ অনুমোদনের পর্যায় থেকেই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে।

বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে প্রকল্পের বাস্তবতা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি ঋণগ্রহীতার প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার নগদ প্রবাহ, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন এবং পর্যাপ্ত ও বাস্তবসম্মত জামানত নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতেই ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। ঋণ বিতরণের পর ব্যাংকের দায়িত্ব শেষ নয়। বরং ঋণের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং যে প্রকল্পের বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়েছে সেটি বাস্তবে কতটা এগোচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

দীর্ঘমেয়াদি মূলধনে শেয়ারবাজারের ভূমিকা বাড়াতে হবে

ঋণখেলাপি কমানোর পাশাপাশি ব্যাংকের ওপর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের চাপ কমাতেও শেয়ারবাজারেকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বড়, স্বচ্ছ ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের জন্য অতিরিক্তভাবে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর না করে শেয়ারবাজারে আসার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

একটি কার্যকর শেয়ারবাজার থাকলে এসব কোম্পানি শেয়ার বা অন্যান্য মূলধনী উপকরণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। এতে ব্যাংকিং খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের চাপ কমার পাশাপাশি করপোরেট খাতে স্বচ্ছতা, আর্থিক তথ্য প্রকাশ ও জবাবদিহিতাও বাড়তে পারে।

কারণ শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানিকে নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ, অডিট এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে জবাবদিহিতার মধ্যে থাকতে হয়।

ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন

অর্থনীতির জন্য ব্যাংক ও শেয়ারবাজারকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ব্যবসায়িক অর্থায়নে ব্যাংকের ভূমিকা থাকবে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহে শেয়ারবাজারের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে।

এ ধরনের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যাংকগুলো উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দেওয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে এবং ভালো কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাবে।

তবে এর জন্য প্রয়োজন একটি আস্থাভিত্তিক ও কার্যকর শেয়ারবাজার। যেখানে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির আর্থিক তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আস্থা রাখবেন, অনিয়মের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা হবে, সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং ভালো কোম্পানি তার মৌলভিত্তির যথাযথ মূল্যায়ন পাবে।

খেলাপি ঋণ কমাতে সমন্বিত সংস্কার দরকার

ঋণখেলাপি শুধু ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নয়, এটি পুরো অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।

ঋণ অনুমোদনে কঠোর যাচাই-বাছাই, ঋণের অর্থের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত জামানত নিশ্চিত করা এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহিতার পাশাপাশি ভালো কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারমুখী করার উদ্যোগ নিতে হবে।

মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি ভারসাম্যপূর্ণ আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ব্যাংকের অর্থ যাবে প্রকৃত ব্যবসায় এবং ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের একটি বড় উৎস হবে শেয়ারবাজার।

শুধু খেলাপি হওয়ার পর ঋণ আদায়ের চেষ্টা নয়, বরং খেলাপি ঋণ তৈরির প্রক্রিয়াটিই বন্ধ করার উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু খেলাপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব, নাকি খেলাপি তৈরির পুরো ব্যবস্থাটাই সংস্কার করব?

Author

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন
শেয়ার বাজার

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।