দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতি, অনিয়ম এবং লাগামহীন খেলাপি ঋণের নেতিবাচক প্রভাব এবার সরাসরি আছড়ে পড়ছে পুঁজিবাজারে। বিনিয়োগকারীদের রক্তক্ষরণ বাড়িয়ে শেয়ারবাজারের ইতিহাসে এই প্রথম প্রায় এক ডজন ব্যাংক একযোগে ‘জেড’ (Z) ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে। মূলত লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থতা এবং আর্থিক খাতের চরম দুর্গতিই এই সংকটের মূলে।
কেন এই অবনমন?
পুঁজিবাজারের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি যদি টানা দুই বছর লভ্যাংশ (Dividend) প্রদানে ব্যর্থ হয়, তবে তাকে মূল মার্কেট থেকে সরিয়ে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর এই অবনমনের পেছনে কাজ করছে তিনটি প্রধান কারণ:
১. প্রভিশন ঘাটতি:
অনেক ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, প্রভিশন ঘাটতি থাকলে কোনো ব্যাংক শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না।
২. খেলাপি ঋণের উচ্চ হার:
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের ওপরে, তারা চাইলেই লভ্যাংশ দিতে পারবে না।
৩. তারল্য সংকট:
অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে অধিকাংশ ব্যাংকের হাতে লভ্যাংশ দেওয়ার মতো নগদ অর্থ বা বিতরণযোগ্য মুনাফা নেই।
বিনিয়োগকারীদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার দশা
শেয়ারবাজারের প্রাণ বলা হয় ব্যাংক খাতকে। অথচ এই খাতের প্রায় এক ডজন ব্যাংকের ক্যাটাগরি পরিবর্তনের খবরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, জেড ক্যাটাগরিতে গেলে:
* শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্রে টি+৩ (T+3) সেটলমেন্ট কার্যকর হয়।
* মার্জিন ঋণের সুবিধা পাওয়া যায় না।
* প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এই শেয়ারগুলো পোর্টফোলিও থেকে বাদ দিতে শুরু করেন, যার ফলে শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক খাতের এই দশা রাতারাতি তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে চলা ঋন জালিয়াতি এবং সুশাসনের অভাবই আজ পুঁজিবাজারকে এই খাদের কিনারে দাঁড় করিয়েছে। যদি একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংক জেড ক্যাটাগরিতে চলে যায়, তবে সূচকের বড় পতন ঠেকানো কঠিন হবে।
“ব্যাংক খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, নতুবা সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হয়ে যাবে।”
তালিকায় কোন ব্যাংকগুলো?
প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৩টি ব্যাংকের নাম আলোচনায় আসছে যারা গত দুই বছর লভ্যাংশ দেয়নি অথবা যাদের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে সংকটে থাকা শরিয়াহ ভিত্তিক বেশ কয়েকটি ব্যাংক এবং রাজনৈতিক প্রভাবাধীন কিছু বেসরকারি ব্যাংক রয়েছে।
শেয়ারবাজারকে স্থিতিশীল রাখতে ব্যাংক খাতের সংস্কার এখন সময়ের দাবি। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা (BSEC) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই মহাধস ঠেকানো প্রায় অসম্ভব। বিনিয়োগকারীরা এখন তাকিয়ে আছেন নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তের দিকে।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।