অর্থ লিপি

২৭ এপ্রিল ২০২৬ সোমবার ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩

‘প্রশ্ন’ ও আমার কোনো প্রত্যাশা নেই কারো কাছে এর- সুরতহাল : আসাদুজ্জামান মানিক

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “অর্থ লিপি.কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  www.facebook.com/OrthoLipi

‘প্রশ্ন’ কবিতাটি টিএম মিলজার হোসেনের লেখা ‘নরক ভূমি’ কাব্যগ্রন্থ থেকে পাঠ করার পর আমার মনে যে ভাবনাটি সবচেয়ে প্রবল হয়ে ধরা দিয়েছে, তা হলো কবির তথাকথিত ‘প্রত্যাশাহীনতা’।

কবি কবিতার শুরুতেই ঘোষণা করেছেন, ‘আমার কোনো প্রত্যাশা নেই কারো কাছে’। আপাতদৃষ্টিতে এটি নিরাসক্ত মনে হলেও, সম্পূর্ণ কবিতাটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে আমি দেখতে পাই— এই নিস্পৃহতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রকৃতি ও মানুষের কাছে এক অনন্ত প্রত্যাশা।

প্রথমত, আমি যখন দেখি কবি মানুষের বদলে ‘পানকৌড়ি’ কিংবা ‘ডাহুক’-এর মতো প্রকৃতির অনুষঙ্গকে সম্বোধন করছেন, তখনই আমার মনে হয় এটি আসলে মানুষের প্রতি তাঁর চরম অভিমান। তিনি মানুষের ওপর আস্থা হারিয়েছেন বলেই প্রকৃতির এই নীরব পাখিদের কাছে প্রত্যাশা রাখছেন।

তিনি চান, এই পাখিরা যেন কেবল ডানা ঝাপটে সময় পার না করে, বরং ‘পৌরাণিক ঈশ্বর পানে’ উড়াল দেয়। এখানে কবির স্পষ্ট একটি প্রত্যাশা কাজ করছে— প্রকৃতি যেন তাঁর হয়ে এই পৃথিবীর বর্তমান সংকটের বার্তাটি মহাবিশ্বের স্রষ্টার কাছে পৌঁছে দেয়। যার কোনো প্রত্যাশা নেই, সে কখনো এমন ব্যাকুল হয়ে বার্তাবাহক খোঁজে না।

কবিতাটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

দ্বিতীয়ত, কবিতার সবচেয়ে মরমি ও যন্ত্রণাদায়ক অংশটি যখন আমার চোখে পড়ে— ‘সবুজ ভূমি ঢেকে গেছে লাল রক্তে’—তখন আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি কবির এই দায়বদ্ধতার জায়গাটি কত গভীর। একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে কবি চারপাশের এই সহিংসতা আর রক্তপাত সইতে পারছেন না। তাঁর এই আক্ষেপই আমাকে বুঝিয়ে দেয় যে, তিনি মনেপ্রাণে একটি শান্তিময় এবং মানবিক পৃথিবীর প্রত্যাশা করেন। সমাজ ও মানুষের কাছে তাঁর যে সামাজিকতার এবং নৈতিকতার দাবি ছিল, তা পূরণ হয়নি বলেই তিনি আজ নিজেকে প্রত্যাশাহীন বলে ঘোষণা করছেন। এই হাহাকার আসলে তাঁর গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ।

তৃতীয়ত, ঈশ্বরের প্রতি কবির যে তীক্ষ্ণ শ্লেষ— ‘তোমার কি অনেক ব্যস্ততা?/নাকি তোমায় বলবো/শুধুই পৌরাণিক লেনদেন বিক্রেতা!’—তা আমার কাছে কেবল অবজ্ঞা মনে হয়নি। বরং এটি হলো স্রষ্টার কাছে ন্যায়বিচারের এক চূড়ান্ত দাবি। কবি আশা করেন, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মহাজাগতিক কোনো শক্তি কথা বলবে। যখন দেখেন সেই শক্তিও নীরব, তখন তিনি অভিমানে ঈশ্বরকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেন। এই প্রশ্ন করার অধিকারটুকু তিনি তখনই লাভ করেন, যখন তাঁর হৃদয়ে একটি ন্যায়নিষ্ঠ পৃথিবীর প্রবল প্রত্যাশা বিদ্যমান থাকে।

পরিশেষে আমি বলতে পারি, কবির ‘কোনো প্রত্যাশা নেই’ দাবিটি আসলে তাঁর এক প্রকার ‘ছদ্মবেশ’। মানুষের ওপর থেকে সাময়িক বিশ্বাস হারিয়ে তিনি যে অভিমান করেছেন, তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে আছে এক সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবীর স্বপ্ন। তাঁর এই যন্ত্রণাকাতর পঙক্তিগুলোই আমার কাছে সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ যে, তিনি পৃথিবীর এই রক্তক্ষয়ী বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারছেন না। সুতরাং, কবির এই তথাকথিত শূন্যতা আসলে এক বিশাল অপূর্ণ প্রত্যাশারই নামান্তর।

Author

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন
শেয়ার বাজার

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।