বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ঘোষিত আয়, নগদ প্রবাহ, রিজার্ভ ও লভ্যাংশের মধ্যে যৌক্তিক সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষ করে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জনের পরও যেসব কোম্পানি নামমাত্র লভ্যাংশ ঘোষণা করছে, সে সব ক্ষেত্রে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও লভ্যাংশ নীতির যৌক্তিকতা পর্যালোচনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করেন শেয়ারবাজার বিশ্লেষক মোঃ আলমগীর হোসেন।
‘বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়ন্ত্রকদের কার্যকর ভূমিকা জরুরি’ শীর্ষক এক কলামে তিনি এসব মতামত তুলে ধরেন।
আলমগীর হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পতনের চাপ থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না দেশের পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট, তারল্যের সীমাবদ্ধতা এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন ও লভ্যাংশ ঘোষণায় অসংগতিসহ বিভিন্ন বিষয় এ পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে ঘোষিত আয় ও লভ্যাংশের মধ্যে সামঞ্জস্যের অভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।
তালিকাভুক্তির আগে এক চিত্র, পরে ভিন্ন বাস্তবতা
লেখকের মতে, তালিকাভুক্তির সময় কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা, মুনাফা ও প্রবৃদ্ধির চিত্র বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা হয়। কিন্তু তালিকাভুক্তির এক থেকে তিন বছরের মধ্যে কোনো কোনো কোম্পানির লভ্যাংশ কমতে থাকে। একপর্যায়ে কিছু কোম্পানি লভ্যাংশ দেওয়াও বন্ধ করে দেয়।
এ পরিস্থিতিতে তালিকাভুক্তির আগে উপস্থাপিত আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনার সঙ্গে পরবর্তী সময়ের বাস্তব পারফরম্যান্সের এত পার্থক্য কেন দেখা যাচ্ছে, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তবে ব্যবসায়িক মন্দা, ঋণের বোঝা, সম্প্রসারণ পরিকল্পনা কিংবা কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজনের কারণে কোনো কোম্পানির লভ্যাংশ কমতে পারে বলে উল্লেখ করেন আলমগীর হোসেন। তাঁর মতে, সমস্যা তখনই গুরুতর হয়ে ওঠে, যখন কোনো কোম্পানি উল্লেখযোগ্য মুনাফা দেখানোর পরও নামমাত্র লভ্যাংশ দেয়, অথচ সেই সিদ্ধান্তের পেছনে যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকে না।
বিপুল রিজার্ভ থাকলেও লভ্যাংশ কম কেন?
কিছু তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের তুলনায় রিজার্ভের পরিমাণ অনেক বেশি বলে উল্লেখ করে লেখক প্রশ্ন তোলেন, বিপুল রিজার্ভ থাকার পরও এসব কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী লভ্যাংশ দিতে পারছে না কেন।
তিনি অবশ্য স্বীকার করেন, রিজার্ভে থাকা অর্থের পুরোটাই নগদে বিতরণযোগ্য নয়। ব্যবসা সম্প্রসারণ, সম্পদ অর্জন, ঋণ পরিশোধ এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের জন্য অর্থ ধরে রাখার প্রয়োজন হতে পারে।
তবে রিজার্ভের ব্যবহার, অর্থের প্রকৃত অবস্থান, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং শেয়ারহোল্ডারদের সম্ভাব্য সুফল সম্পর্কে কোম্পানির স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
আলমগীর হোসেনের মতে, বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির ব্যবসায়িক ঝুঁকি বহন করেন। তাই কোম্পানি মুনাফা অর্জন করলেও শেয়ারহোল্ডাররা সামান্য লভ্যাংশ পেলে এবং মুনাফার বড় অংশ ধরে রাখার যৌক্তিকতা পরিষ্কার না হলে তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ডিএসই ও বিএসইসির কার্যকর নজরদারির ওপর গুরুত্ব
তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন, তথ্য প্রকাশের যথার্থতা এবং করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন লেখক।
তাঁর মতে, কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনা বা না কেনার সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীর নিজস্ব। তবে কোম্পানির প্রকাশিত আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতা, নিয়ম অনুযায়ী তথ্য প্রকাশ এবং সব বিনিয়োগকারীর জন্য সমান তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা নিয়ন্ত্রক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ধারাবাহিকভাবে উল্লেখযোগ্য মুনাফা দেখিয়েও নামমাত্র লভ্যাংশ ঘোষণা করা কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া এবং আয়, ব্যয়, নগদ প্রবাহ, রিজার্ভ ও লভ্যাংশ নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা পর্যালোচনার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি, মুনাফার তুলনায় দুর্বল নগদ প্রবাহ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেন এবং আর্থিক প্রতিবেদনের সম্ভাব্য অসংগতিগুলো যথাযথভাবে পরীক্ষা করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
মুনাফার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার প্রস্তাব
ঘোষিত মুনাফা ও লভ্যাংশের মধ্যে যৌক্তিক সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠায় একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছেন আলমগীর হোসেন।
তিনি মনে করেন, কোনো কোম্পানি উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করলে, পর্যাপ্ত নগদ অর্থ থাকলে এবং ঋণ পরিশোধ বা প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের বড় চাপ না থাকলে মুনাফার একটি যুক্তিসংগত অংশ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
এ ক্ষেত্রে নীতিগত আলোচনার অংশ হিসেবে বিতরণযোগ্য মুনাফার অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ লভ্যাংশ হিসেবে দেওয়ার মানদণ্ড বিবেচনার প্রস্তাব দেন তিনি।
তবে সব কোম্পানির জন্য একই নিয়ম নির্বিচারে প্রয়োগের পক্ষে নন আলমগীর হোসেন। তাঁর মতে, কোম্পানির নগদ প্রবাহ, ঋণের দায়, মূলধনি ব্যয়, ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রক শর্ত এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বিবেচনায় যুক্তিসংগত ব্যতিক্রমের সুযোগ থাকতে হবে।
তাঁর বক্তব্য, লভ্যাংশ কম দেওয়ার পেছনে যৌক্তিক কারণ থাকলে তা বিনিয়োগকারীদের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরতে হবে।
শুধু মুনাফা নয়, নগদ প্রবাহও গুরুত্বপূর্ণ
কোনো কোম্পানির আয় বাড়লেই তার আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয় বলে মনে করেন আলমগীর হোসেন।
তাঁর মতে, পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে, নগদ প্রবাহ দুর্বল থাকলে কিংবা ঘোষিত মুনাফার বিপরীতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ তৈরি না হলে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
এ কারণে কোম্পানির পরিচালন মুনাফা, নিট মুনাফা, নগদ প্রবাহ, ঋণ, রিজার্ভ এবং লভ্যাংশ প্রদানের ইতিহাস সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
কোনো কোম্পানি লভ্যাংশ দিতে না পারলে বা ধারাবাহিকভাবে লভ্যাংশ কমিয়ে দিলে তার কারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার ব্যবস্থা থাকা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে
পুঁজিবাজারের উন্নয়ন বলতে শুধু তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানোকে বোঝায় না। বরং আর্থিকভাবে সক্ষম, স্বচ্ছ, সুশাসনসম্পন্ন এবং বিনিয়োগকারীদের প্রতি দায়বদ্ধ কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি বলে উল্লেখ করেন লেখক।
তাঁর মতে, নতুন ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যমান কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারক করতে হবে। তালিকাভুক্তির সময় নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণের ভিত্তিতে বাজারে আসা কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়েও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সাত দফা প্রত্যাশা
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনে সাতটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আলমগীর হোসেন। এগুলো হলো:
১. তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও প্রকাশিত তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করা।
২. ঘোষিত মুনাফা, নগদ প্রবাহ, রিজার্ভ ও লভ্যাংশের মধ্যে সামঞ্জস্য পর্যালোচনা করা।
৩. ধারাবাহিকভাবে নামমাত্র লভ্যাংশ দেওয়া বা লভ্যাংশ বন্ধ রাখার পেছনে যৌক্তিক কারণ প্রকাশের ব্যবস্থা করা।
৪. অস্বাভাবিক ব্যয়, আর্থিক অসংগতি ও করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা যথাযথভাবে তদন্ত করা।
৫. কোম্পানির রিজার্ভ ও মুনাফা ধরে রাখার পরিকল্পনা সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের স্বচ্ছ ধারণা দেওয়া।
৬. তালিকাভুক্তির পরও কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্স নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
৭. নতুন তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে মানসম্পন্ন কোম্পানি আনার উদ্যোগ নেওয়া।
বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাই হোক অগ্রাধিকার
কলামের উপসংহারে আলমগীর হোসেন বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কোম্পানির ঘোষিত আয় ও লভ্যাংশের মধ্যে যুক্তিসংগত সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
বিনিয়োগকারীদের অর্থ দিয়ে কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করবে, সম্পদ বাড়াবে এবং মুনাফা অর্জন করবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে অর্জিত মুনাফার কতটুকু ব্যবসায় পুনর্বিনিয়োগ করা হচ্ছে, কতটুকু রিজার্ভে রাখা হচ্ছে এবং শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কী ধরনের সুফল তৈরি হচ্ছে, তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকতে হবে।
তাঁর বিশ্বাস, ডিএসই, বিএসইসি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন এবং দেশের পুঁজিবাজারকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পথে ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব।
লেখকের প্রত্যাশা, পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক: মোঃ আলমগীর হোসেন, শেয়ারবাজার বিশ্লেষক।