অর্থ লিপি

৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বুধবার ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

কত ট্রেড আনতে পারবেন! কমিশনের দৌড়ে ব্রোকারেজ হাউজ, টার্গেটে চাপে বাড়ছে ঝুঁকি

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “অর্থ লিপি.কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  www.facebook.com/OrthoLipi

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট, দুর্বল কর্পোরেট গভর্ন্যান্স, নীতির অনিশ্চয়তা, মার্জিন ঋণ এবং বাজার কারসাজির মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়ে আসছে। তবে এর পাশাপাশি পুঁজিবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত সমস্যা হলো অতিরিক্ত কমিশন নির্ভর ট্রেডিং সংস্কৃতি।

বাজারসংশ্লিষ্টদের একটি অংশের অভিযোগ, দেশের কিছু সিকিউরিটিজ হাউজে নতুন কর্মী নিয়োগের সময় শুধু তার পেশাগত দক্ষতা বা বিনিয়োগকারীদের সেবা দেওয়ার সক্ষমতাই বিবেচনা করা হয় না। বরং একজন কর্মী কত টাকা বা কত ফান্ডের গ্রাহক আনতে পারবেন এবং মাসে কত পরিমাণ ট্রেড করাতে পারবেন, এমন লক্ষ্যও নিয়োগের আলোচনায় গুরুত্ব পায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

কথিত আছে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির ইন্টারভিউতেও প্রার্থীর কাছে প্রশ্ন থাকে, ‘আপনি কত ফান্ড আনতে পারবেন? মাসে কত ট্রেড করে দিতে পারবেন? ‘আপনার মাধ্যমে কত টাকার ব্যবসা হবে?’

এরপর শুরু হয় বেতন ও ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে দর-কষাকষি।

প্রশ্ন হলো, একজন কর্মীর পারিশ্রমিক যদি তার আনা ফান্ড ও উৎপাদিত ট্রেডের পরিমাণের সঙ্গে অতিমাত্রায় যুক্ত থাকে, তাহলে সেই কর্মী কি সব সময় বিনিয়োগকারীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে পারবেন?

‘কত ট্রেড করবেন’ প্রশ্নটি কি উদ্বেগের কারণ?

ব্রোকারেজ ব্যবসায় লেনদেন থেকে কমিশন আয় একটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক বাস্তবতা। একজন কর্মী গ্রাহক নিয়ে আসবেন, গ্রাহক লেনদেন করবেন এবং প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক আয় করবে, এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।

সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন ট্রেডের পরিমাণই একজন কর্মীর সাফল্যের প্রধান মাপকাঠিতে পরিণত হয়।

কারণ একজন বিনিয়োগকারীর জন্য প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে ট্রেড করাই সবসময় লাভজনক নয়। অনেক সময় একজন ভালো বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে কোনো ট্রেড না করা।

কিন্তু কর্মীর মূল্যায়ন যদি নির্ভর করে তিনি মাসে কত ট্রেড করালেন, তাহলে সেখানে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

একদিকে কর্মীর লক্ষ্য থাকবে বেশি কমিশন তৈরি করা, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীর প্রয়োজন হতে পারে কম ট্রেড করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ধরে রাখা।

এই দুই স্বার্থ যখন মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েন সাধারণ বিনিয়োগকারী।

ট্রেড বাড়ানোর প্রতিযোগিতা

পুঁজিবাজারে বিভিন্ন সিকিউরিটিজ হাউজের মধ্যে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক। কে বেশি গ্রাহক আনবে, কে বেশি সম্পদ ব্যবস্থাপনা করবে। কে বেশি ভালো সেবা দেবে, কে প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকবে। এসব ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বাজারের জন্য ইতিবাচক।

কিন্তু প্রতিযোগিতার প্রধান মাপকাঠি যদি হয়ে যায় কে কত বেশি ট্রেড করল, তখন বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পায়।

বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটিজ হাউজগুলোর মধ্যে লেনদেনের পরিমাণে শীর্ষস্থান অর্জনের প্রতিযোগিতা যদি কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে, তাহলে তার প্রভাব পুরো বাজারে পড়তে পারে।

একটি হাউজ হয়তো বছরের শেষে বলতে পারে, তারা লেনদেনের পরিমাণে বাজারে প্রথম হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হওয়া উচিত—

এই লেনদেনের কত অংশ প্রকৃত বিনিয়োগের প্রয়োজন থেকে এসেছে আর কত অংশ এসেছে অতিরিক্ত ট্রেডিংয়ের সংস্কৃতি থেকে?

নাম্বার ওয়ান হওয়ার দৌড়

পুঁজিবাজারে একটি সিকিউরিটিজ হাউজের লেনদেনের অবস্থান অবশ্যই ব্যবসায়িকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু লেনদেনের পরিমাণ দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য বিচার করা হলে বড় একটি বিষয় বাদ পড়ে যায়।

একটি হাউজের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত—

* কতজন দীর্ঘমেয়াদি ও সন্তুষ্ট বিনিয়োগকারী তৈরি করেছে।
* গ্রাহকের সম্পদ কতটা সুরক্ষিত রেখেছে।
* বিনিয়োগকারীদের কতটা মানসম্মত গবেষণা ও পরামর্শ দিয়েছে।
* কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করেছে।
* গ্রাহকের অভিযোগ কত দ্রুত নিষ্পত্তি করেছে।
* বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কতটা ভূমিকা রেখেছে।
* সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, গ্রাহকের স্বার্থকে কতটা অগ্রাধিকার দিয়েছে।

শুধু ‘লেনদেনে নাম্বার ওয়ান’ হওয়া যদি সাফল্যের প্রধান পরিচয় হয়ে যায়, তাহলে ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জনের চাপ শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীর ওপর স্থানান্তরিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

সাধারণ বিনিয়োগকারীই কেন বলি হন

ধরা যাক, একজন বিনিয়োগকারী দীর্ঘমেয়াদে একটি ভালো কোম্পানির শেয়ার ধরে রাখতে চান। তার বিনিয়োগের মৌলিক ভিত্তিতে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি।

কিন্তু তাকে বারবার বলা হলো, বাজারে সুযোগ এসেছে, এখন কিনুন; আবার কিছুদিন পর বিক্রি করুন; এরপর অন্য শেয়ারে যান।

প্রতিটি লেনদেনে বিনিয়োগকারী কমিশন, চার্জ ও অন্যান্য খরচ বহন করেন।

একবারে হয়তো খরচ সামান্য। কিন্তু অতিরিক্ত ট্রেডিংয়ের কারণে দীর্ঘমেয়াদে সেই খরচ উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।

আর বিনিয়োগকারী যদি প্রতিটি ট্রেডে লাভ করতে না পারেন, তাহলে তার মূলধনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অর্থাৎ, হাউজের কমিশন বাড়তে পারে, কিন্তু বিনিয়োগকারীর সম্পদ নাও বাড়তে পারে।

এখানেই স্বার্থের সংঘাতের মূল প্রশ্নটি তৈরি হয়।

কমিশন নির্ভর সংস্কৃতি বনাম বিনিয়োগকারী-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি

একটি আধুনিক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক মডেল অবশ্যই লাভজনক হতে হবে। কর্মীদের বেতন, অফিস পরিচালনা, প্রযুক্তি, গবেষণা, কমপ্লায়েন্স এবং অন্যান্য ব্যয় মেটাতে প্রতিষ্ঠানকে আয় করতে হবে।

কিন্তু ব্যবসায়িক আয় ও বিনিয়োগকারীর স্বার্থকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ বানানো যাবে না।

বরং দীর্ঘমেয়াদে সফল ব্রোকারেজ ব্যবসার ভিত্তি হওয়া উচিত—

“বিনিয়োগকারী লাভবান হলে প্রতিষ্ঠানও লাভবান হবে।”

অর্থাৎ Transaction-Driven culture-এর পরিবর্তে প্রয়োজন Client-Centric Culture.

কর্মীদের ওপর অস্বাভাবিক টার্গেটের প্রভাব

যদি একজন কর্মকর্তা জানেন যে তার চাকরি, বেতন বৃদ্ধি, ইনসেনটিভ বা ভবিষ্যৎ পদোন্নতি নির্ভর করছে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফান্ড আনা কিংবা নির্দিষ্ট পরিমাণ ট্রেড তৈরির ওপর, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তার মধ্যে লক্ষ্য পূরণের চাপ তৈরি হতে পারে।

এক্ষেত্রে কয়েকটি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে

প্রথমত প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ট্রেড করার প্রবণতা।

দ্বিতীয়ত বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি গ্রহণক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে লেনদেনের পরামর্শ দেওয়ার ঝুঁকি।

তৃতীয়ত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি ট্রেডিংকে উৎসাহিত করা।

চতুর্থত গ্রাহক ধরে রাখার পরিবর্তে কমিশন উৎপাদনকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখা।

পঞ্চমত কর্মীদের মধ্যে ‘কে বেশি ব্যবসা আনতে পারে’ ধরনের অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়া।

সব প্রতিষ্ঠানে এমন সংস্কৃতি রয়েছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তবে যেখানে এ ধরনের চাপ রয়েছে, সেখানে বিষয়টি নিয়ন্ত্রক ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ব্যাংকের সিকিউরিটিজ হাউজগুলোর প্রতিযোগিতা

বর্তমানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক সিকিউরিটিজ ব্যবসা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাজারে অবস্থান ধরে রাখা এবং লেনদেন বাড়ানোর প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক।

কিন্তু প্রতিযোগিতাটি যদি সেবার মান, গবেষণা, প্রযুক্তি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগকারী সন্তুষ্টির পরিবর্তে শুধুই ট্রেডের পরিমাণকে কেন্দ্র করে হয়, তাহলে সেটি বাজারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর নাও হতে পারে।

কারণ তখন প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের লেনদেন বাড়াতে চাইবে।

একটি প্রতিষ্ঠান ১০০ কোটি টাকা লেনদেন করলে অন্যটি ১২০ কোটি করতে চাইবে। এরপর আরেকটি প্রতিষ্ঠান ১৫০ কোটি করতে চাইবে।

এভাবে বাজারের মোট লেনদেন বাড়লেও প্রশ্ন থেকে যায়, সেই লেনদেনের কতটুকু প্রকৃত বিনিয়োগের প্রয়োজন থেকে সৃষ্টি হয়েছে?

বেশি লেনদেন মানেই শক্তিশালী বাজার নয়

পুঁজিবাজারের শক্তি শুধু দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না।

একটি বাজার শক্তিশালী হয় যখন সেখানে—

ভালো কোম্পানি থাকে, স্বচ্ছ তথ্য থাকে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ থাকে, পর্যাপ্ত তারল্য থাকে, বাজারে ন্যায্য মূল্য আবিষ্কার হয় এবং বিনিয়োগকারীরা তাদের অধিকার সুরক্ষিত মনে করেন।

অন্যদিকে কৃত্রিমভাবে বা অতিরিক্ত ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন বাড়ানো হলে তা সাময়িকভাবে পরিসংখ্যানকে আকর্ষণীয় দেখাতে পারে, কিন্তু বাজারের মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী করে না।

তাহলে সমাধান কী?

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

১. কর্মী মূল্যায়নে শুধু ট্রেডের পরিমাণ নয়

কর্মীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে শুধু কত টাকা কমিশন আয় করেছেন তা না দেখে গ্রাহক সন্তুষ্টি, সম্পদ সংরক্ষণ, অভিযোগের সংখ্যা, কমপ্লায়েন্স এবং দীর্ঘমেয়াদি গ্রাহক সম্পর্ক বিবেচনায় আনা যেতে পারে।

২. অস্বাভাবিক ট্রেডিংয়ের ওপর নজরদারি

একই গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিকভাবে ঘন ঘন লেনদেন হলে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার মাধ্যমে তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

৩. গ্রাহকের ঝুঁকি প্রোফাইলকে অগ্রাধিকার

গ্রাহক কত টাকা বিনিয়োগ করেছেন তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি কতটা ঝুঁকি নিতে পারেন। বিনিয়োগ পরামর্শে এই বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

৪. স্বচ্ছ ইনসেনটিভ কাঠামো

কর্মীদের ইনসেনটিভ এমনভাবে নির্ধারণ করা দরকার, যাতে বেশি কমিশনের জন্য গ্রাহককে অপ্রয়োজনীয় ট্রেডে উৎসাহিত করার প্রণোদনা না থাকে।

৫. গবেষণা ও বিনিয়োগ পরামর্শ শক্তিশালী করা

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ট্রেড এক্সিকিউশনের জায়গা না হয়ে গবেষণা, তথ্য ও বিনিয়োগ শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

৬. সিকিউরিটিজ হাউজের র‍্যাংকিংয়ে নতুন সূচক

শুধু লেনদেনের পরিমাণ দিয়ে ‘নাম্বার ওয়ান’ নির্ধারণ না করে গ্রাহক সন্তুষ্টি, নতুন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, কমপ্লায়েন্স, গবেষণা এবং সেবার মানের মতো সূচকও বিবেচনায় আনা যেতে পারে।

নিয়ন্ত্রকের করণীয়

নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ প্রতিটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করা নয়। তবে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে গ্রাহকের স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাত চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

বিশেষ করে অতিরিক্ত ট্রেডিং, গ্রাহকের ঝুঁকি প্রোফাইল উপেক্ষা, অননুমোদিত বিনিয়োগ পরামর্শ, স্বার্থের সংঘাত এবং অনৈতিক কমিশন-চালিত কার্যক্রমের বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

শেষ কথা

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকট শুধু নিয়ন্ত্রক, কোম্পানি বা বিনিয়োগকারীর একার সমস্যা নয়। এটি একটি সমগ্র বাজার ব্যবস্থার সমস্যা।

নিয়ন্ত্রককে যেমন কার্যকর ও পূর্বানুমানযোগ্য হতে হবে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে তেমনি সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীকে সচেতন হতে হবে। আর ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বুঝতে হবে, আজ একজন গ্রাহকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ কমিশন নেওয়া সাফল্য নয়; বরং সেই গ্রাহককে দীর্ঘদিন আস্থার সঙ্গে ধরে রাখা এবং তার সম্পদ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখাই প্রকৃত সাফল্য।

একটি সিকিউরিটিজ হাউজ যদি শুধু এই কারণে গর্ব করে যে তারা লেনদেনের হিসাবে বাজারে প্রথম, তাহলে তার সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও করা প্রয়োজন—

এই বিপুল লেনদেনের পর সেই হাউজের গ্রাহকরা কতটা লাভবান হয়েছেন?

কারণ—

হাউজের ট্রেড বাড়লেই পুঁজিবাজার শক্তিশালী হয় না।
হাউজের কমিশন বাড়লেই বিনিয়োগকারীর সম্পদ বাড়ে না।
সূচক ও লেনদেনের পরিসংখ্যানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বিনিয়োগকারীর আস্থা।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী করতে হলে তাই “কত ট্রেড করালাম” এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে “কতজন বিনিয়োগকারীর আস্থা অর্জন করলাম” এই সংস্কৃতিতে যেতে হবে।

পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা অবশ্যই বাড়বে। কিন্তু সেই ব্যবসার ভিত্তি হতে হবে স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা এবং বিনিয়োগকারীর স্বার্থ।

শেষ পর্যন্ত একটি কথাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—

বিনিয়োগকারী যদি টিকে থাকেন, তবেই পুঁজিবাজার টিকে থাকবে। আর বিনিয়োগকারীর আস্থা যদি হারিয়ে যায়, তাহলে সবচেয়ে বেশি লেনদেন করা প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃত অর্থে বিজয়ী হতে পারবে না।

Author

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন
শেয়ার বাজার

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।