কয়েকদিন আগে ৭০ ঊর্ধ্ব বয়সী এক ব্যক্তির জীবনের একটি হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা জানতে পারলাম।
একসময় তিনি ছিলেন সফল একজন শিল্পপতি। দীর্ঘদিন আমেরিকায় বসবাস করেছেন। অবিবাহিত হওয়ায় নিজের অর্থ-সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তিনি ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের ওপর আস্থা রেখে ছেড়ে দিয়েছিলেন।
কিন্তু অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসার পর তিনি যেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। যাদের ওপর তিনি বছরের পর বছর ভরসা করেছিলেন, তাদের অনেকেই আর পাশে নেই। এমনকি নিজের সম্পদ ও সঞ্চয়ের ওপরও তার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। বর্তমানে তিনি অসুস্থতা, আর্থিক সংকট এবং একাকীত্বের সঙ্গে লড়াই করছেন।
ঘটনাটি শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং আমাদের সমাজের একটি বড় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে অনেক সময় মানুষের চেয়ে সম্পদের মূল্য বেশি হয়ে দাঁড়ায়। অর্থ ও ক্ষমতা থাকলে মানুষকে ঘিরে থাকে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড়। কিন্তু প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে কিংবা আর্থিক সক্ষমতা কমে গেলে সেই বৃত্ত দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের অনেক প্রবীণ মানুষ কোনো না কোনোভাবে অবহেলা, উপেক্ষা কিংবা মানসিক নিগ্রহের শিকার হন। বিশেষ করে যারা বার্ধক্যে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন, তাদের অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, যত্ন ও সম্মান থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।
বার্ধক্যে মানসিক ও আর্থিক নিরাপত্তা একজন মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অন্যতম প্রধান শর্ত। তাই জীবনের শেষ অধ্যায়কে নিরাপদ ও সম্মানজনক করতে কিছু বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
প্রথমত, জীবিত অবস্থায় নিজের সব সম্পদ সম্পূর্ণভাবে অন্যের নামে লিখে না দেওয়াই অনেক ক্ষেত্রে বিচক্ষণতার পরিচয়। আর্থিক স্বাধীনতা মানুষকে আত্মমর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।
দ্বিতীয়ত, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং সুন্দর আচরণ করা প্রয়োজন। ভালো ব্যবহার মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা তৈরি করে।
তৃতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় রাগ, কঠোরতা ও নেতিবাচক আচরণ ভবিষ্যতে পারিবারিক দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে। তাই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।
এছাড়া নিয়মিত হাঁটা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, বই পড়া, সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা সুস্থ বার্ধক্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় মূল্যবোধও বার্ধক্যে মানসিক প্রশান্তি এনে দিতে পারে। মুসলমানদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত এবং আল্লাহর কাছে সুস্থতা ও উত্তম পরিণতির জন্য দোয়া হৃদয়কে প্রশান্ত রাখে এবং জীবনের শেষ অধ্যায়ের জন্য প্রস্তুত হতে সহায়তা করে।
মনে রাখা প্রয়োজন, আজ যাদের আমরা বৃদ্ধ বলছি, একদিন আমরাও সেই পথের যাত্রী হব।
তাই শুধু সম্পদ নয়, সম্পর্কেও বিনিয়োগ করুন। শুধু অর্থ সঞ্চয় নয়, মানুষের ভালোবাসা, সম্মান ও আস্থা অর্জনের চেষ্টাও করুন। কারণ জীবনের শেষ সময়ে মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অনুভব করে একজন আন্তরিক মানুষের উপস্থিতি।
Author
-
মোঃ জসিম উদ্দিন তালুকদার দেশের পুঁজিবাজারের সাথে সরাসরি যুক্ত। তিনি উপ-মহাব্যবস্থাপক, জাহান সিকিউরিটিজ লিমিটেডের। পোর্টফোলিও পরিচালনায় সুদক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। তিনি ২০ বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সহিত পুঁজিবাজারের সাথে যুক্ত আছেন।
View all posts