বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে এখন শুধু সূচক বাড়ানো কিংবা লেনদেনের পরিমাণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। বাজারের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
কারণ একজন বিনিয়োগকারীর ক্ষতি শুধু শেয়ারের দর কমে গেলেই হয় না। বাজারের প্রতি আস্থা হারিয়েও একজন বিনিয়োগকারী বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন।
গত কয়েক মাসে দেশের শেয়ারবাজারে ধীরে ধীরে যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তাতে অনেক বিনিয়োগকারী নতুন করে বাজারে ফিরেছিলেন। পুরোনো বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ দীর্ঘদিনের লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। বাজারে লেনদেন বেড়েছিল, অনেক শেয়ারের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছিল। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই আস্থায় আবারও বড় ধাক্কা লেগেছে।
মার্জিন ঋণসংক্রান্ত বিধিমালা, বিভিন্ন পর্যায়ের বক্তব্য, নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভ্রান্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা গুজব বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আতঙ্কিত বিক্রি ও বাজারের স্বাভাবিক সংশোধন।
ফলে অনেক বিনিয়োগকারী এখন প্রশ্ন করছেন, যে বাজারে গত ছয় মাসে ধীরে ধীরে আস্থা তৈরি হয়েছিল, সেটি মাত্র কয়েকটি কার্যদিবসের মধ্যেই কেন আবার এতটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ল?
তথ্যের সমতা নিশ্চিত করা জরুরি
একটি কার্যকর পুঁজিবাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো তথ্যের সমতা।
একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী যেন বিশ্বাস করতে পারেন, কোনো কোম্পানির মূল্যসংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের আগে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী তা জেনে সুবিধা নিতে পারবে না। কোনো নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তের তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব আকারে ছড়িয়ে পড়ার আগেই তার নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে।
কিন্তু যখন বিনিয়োগকারীরা অফিসিয়াল তথ্যের আগে বিভিন্ন ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব ভিডিও, মেসেঞ্জার গ্রুপ কিংবা কথিত ‘ভেতরের খবরের’ ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন, তখন বাজারে তথ্যের অসমতা তৈরি হয়।
আর তথ্যের অসমতা থেকেই তৈরি হয় অবিশ্বাস।
গুজবের বাজার কখনো সুস্থ বাজার হতে পারে না
শেয়ারবাজারে গুজব নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কারণে এর প্রভাব এখন অনেক বেশি।
একটি ভুল তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার বিনিয়োগকারীর কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কেউ যাচাই না করেই শেয়ার বিক্রি করেন, কেউ আবার সেই গুজবের ভিত্তিতে শেয়ার কিনে ফেলেন।
এর ফলে কোম্পানির প্রকৃত ব্যবসা, আয়, সম্পদ কিংবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার পরিবর্তে গুজবই যদি শেয়ারের দাম নির্ধারণ করতে শুরু করে, তাহলে সেটি আর স্বাভাবিক বাজার থাকে না।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে বাজারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হলে দ্রুত শনাক্ত করে দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার যোগাযোগ আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার
নীতিমালা বা বিধিমালার পরিবর্তন বাজারের স্বার্থেই করা হতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তন সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যদি বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তাহলে ভালো উদ্যোগও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
কোনো নতুন বিধিমালা কার্যকর করার আগে এর উদ্দেশ্য, বিনিয়োগকারীদের ওপর প্রভাব, বাস্তব প্রয়োগের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সহজ ভাষায় পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের জন্য একটি একক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র থাকা দরকার।
যাতে বিনিয়োগকারীরা জানেন, কোন তথ্য সত্য এবং কোনটি গুজব।
আস্থা ফিরবে কীভাবে?
বাজারের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কয়েকটি বিষয়ে কঠোরভাবে নজর দেওয়া জরুরি।
প্রথমত, মূল্যসংবেদনশীল তথ্য আগাম পাচার বন্ধ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে বাজার কারসাজির চেষ্টা করলে দ্রুত তদন্ত ও দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত ও বিধিমালার ব্যাখ্যা দ্রুত এবং পরিষ্কারভাবে বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
চতুর্থত, সব বিনিয়োগকারীর জন্য তথ্যপ্রাপ্তির সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, বাজারে কোনো অস্বাভাবিক মূল্য ও লেনদেন দেখা দিলে শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীর ওপর নজর না দিয়ে এর পেছনে থাকা প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকেও খুঁজে বের করতে হবে।
সূচক নয়, আস্থাই হোক বাজার উন্নয়নের মূল সূচক
একটি বাজারকে শুধু DSEX কত পয়েন্ট বাড়ল কিংবা দৈনিক কত কোটি টাকা লেনদেন হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না।
একটি সুস্থ বাজার হলো সেই বাজার, যেখানে বিনিয়োগকারী জানেন যে তার কাছে থাকা তথ্য অন্য বিনিয়োগকারীর কাছেও রয়েছে। যেখানে গুজবের চেয়ে তথ্যের মূল্য বেশি। যেখানে দুর্বল কোম্পানির শেয়ার কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীকে ফাঁদে ফেলার সুযোগ কম। যেখানে ভালো কোম্পানির মৌলভিত্তি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাই দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করে।
কারণ একটি বাজারে টাকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু টাকার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আস্থা।
গত ছয় মাসে বিনিয়োগকারীরা যে আস্থা ফিরে পেয়েছিলেন, সেই আস্থা যদি কয়েকটি গুজব, অস্পষ্ট বক্তব্য, তথ্যের অসমতা কিংবা আকস্মিক নীতিগত পরিবর্তনের কারণে আবার হারিয়ে যায়, তাহলে শুধু সূচক বাড়িয়ে বাজারকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করা সম্ভব হবে না।
বিনিয়োগকারীর ক্ষতি শুধু শেয়ারের দরে হয় না, আস্থা হারালেও ক্ষতি হয়।
তাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ সূচককে জোর করে ওপরে তোলা নয়। বরং এমন একটি বাজার তৈরি করা, যেখানে বিনিয়োগকারী বিশ্বাস করতে পারেন, তথ্য সবার জন্য সমান, নিয়ম সবার জন্য সমান এবং বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা সবার ক্ষেত্রেই সমান।
হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলেই টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।