স্বল্প পুঁজি নিয়ে দরিদ্র পরিবারের যে শিক্ষিত তরুণ ভালো উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনিও সফল উদ্যোক্তা হওয়ার সমান সম্ভাবনা রাখেন। বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে অসংখ্য প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়।
এর প্রধান কারণ হচ্ছে সঠিক প্রশিক্ষণের অভাব, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক অবস্থা ও ঝুঁকি। এছাড়াও বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে যে সকল চ্যালেঞ্জ এর সম্মুখীন হতে হয় সেগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো
পুঁজি বা অর্থের অভাব
অনেক উদ্যোক্তা পর্যাপ্ত অর্থ ছাড়াই ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা করেন, যা বড় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করে। স্টার্টআপ খরচ, প্রাথমিক কার্যক্রম চালানোর জন্য পর্যাপ্ত পুঁজি প্রয়োজন, যা অনেক ক্ষেত্রেই সহজলভ্য নয়। ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে জটিলতা, উচ্চ সুদের হার, ঋণ বা অর্থনৈতিক সহায়তা পাওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং যথাযথ বিনিয়োগকারীর অভাব উদ্যোক্তার অনুপ্রেরণার পথে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
ঝুঁকি গ্রহণের ভয়
উদ্যোক্তা হিসেবে ঝুঁকি নেওয়া একটি অপরিহার্য অংশ। তবে অনেকেই বিনিয়োগ বা বাজারের ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী থাকেন। উদ্যোক্তা হতে হলে ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা থাকতে হয়। ব্যর্থতাকে সামাজিকভাবে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়, যা মানুষকে ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত করে।
পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনার অভাব
সঠিক পরিকল্পনা ও কৌশল ছাড়া কোনো ব্যবসায় দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উদ্যোক্তাদের দক্ষতা এবং জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা প্রয়োজন। ব্যবসার কার্যপ্রণালি, মার্কেট স্ট্রাটেজি, বা আর্থিক ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা না থাকলে সফলতা পাওয়া কঠিন।
মেন্টরশিপ ও নেটওয়ার্কের অভাব
উদ্যোক্তা হওয়ার পথে অনেক সময় মানসিক চাপ ও হতাশার সম্মুখীন হতে হয়। ধৈর্য, মানসিক শক্তি ও অনুপ্রেরণা ধরে রাখতে না পারলে ব্যবসায়িক সফলতা পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। অভিজ্ঞ মেন্টর ও শক্তিশালী নেটওয়ার্ক উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে অনেকেই এই ধরনের উপযোগী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন।
প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও বাজার বিশ্লেষণের অভাব
আন্তর্জাতিক বাজার ও প্রযুক্তির সাথে দ্রুত সামঞ্জস্য রেখে ই-কমার্স, ফিনটেক, এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত ব্যবসায়িক মডেলের পর্যাপ্ত জ্ঞান ও ব্যবহারের সুযোগ গ্রহণ করতে না পারা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সঠিকভাবে বাজার ও গ্রাহকদের চাহিদা বিশ্লেষণ, পণ্য বা সেবার সঠিক মূল্য নির্ধারণ, বিদেশি কোম্পানির সাথে প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক মান অর্জনে উদ্ভাবনী ধারণা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের প্রয়োজন।
উদ্যোক্তা উন্নয়নে পর্যাপ্ত নীতি সহায়তার অভাব
সরকারের তরফ থেকে বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য পর্যাপ্ত সহায়ক নীতি বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবায়িত হয় না। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কার্যকরী নীতিমালা প্রণয়নেও ঘাটতি রয়েছে। সরকারি নীতি ও নিয়মাবলি ও অনেক ক্ষেত্রেই উদ্যোক্তা বান্ধব নয়, যা নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠার পথে বড় চ্যালেঞ্জ।
আইনি এবং প্রশাসনিক জটিলতা
ব্যবসায় শুরুর জন্য অনেক সময় নানা ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক জটিলতা মোকাবিলা করতে হয়। লাইসেন্স, অনুমোদন, কর ব্যবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় লাগে এবং কাগজপত্র প্রস্তুত বা অনুমোদনের জন্য দুর্নীতি বা ঘুষের মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
সামাজিক নিরাপত্তার অভাব
ঝুঁকি নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণ পরিবারের ভবিষ্যৎ আর্থিক, সামাজিক ও মনস্তাত্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখার একটা মানসিকতা আমাদেরকে সামগ্রিকভাবে উদ্যোক্তার প্রতি সহানুভূতিশীল হতে দেয় না। উদ্যোক্তাদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক মনোভাব থাকায় অনেকেই স্থিতিশীল চাকরি বা নিরাপদ পেশা পছন্দ করেন এবং ব্যবসায়িক ঝুঁকি নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এছাড়াও ব্যাবসা বেদখল, সন্ত্রাসী/চাঁদাবাজদের উপদ্রব আপনাকে ক্ষমতাশালী পক্ষের ছত্রছায়ায় থাকা বা কারো সাহায্য নিতে বাধ্য করে, নিয়ে যায় সাধারণ জনগণ থেকে দলীয় পরিচয়ের দিকে।
নারীরা উদ্যোক্তা হতে প্রতিবন্ধকতা
একজন পুরুষের সমান যোগ্যতা সম্পন্ন হলেও, শুধু নারী বলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি পরিবারের ভিন্ন আচরণের সম্মুখীন হতে হয় একজন নারী উদ্যোক্তাকে।
এই চ্যালেঞ্জগুলো চিনতে পারলে এবং সেগুলোর সমাধান খুঁজে বের করতে পারলেই উদ্যোক্তা হওয়ার পথে সাফল্য অর্জন করা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।