শেয়ারবাজারের স্বাভাবিক ওঠানামায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। তবে কোনো শেয়ার বা লেনদেনে অস্বাভাবিকতা কিংবা অনিয়ম ধরা পড়লে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বাজারের কাঠামোগত সংস্কার ও আধুনিকায়নে একগুচ্ছ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
সোমবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর নিকুঞ্জ-২ এলাকায় ডিএসই টাওয়ারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক উন্মুক্ত আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি।
বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামায় হস্তক্ষেপ নয়
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বাজারের দৈনন্দিন ওঠানামায় কমিশন কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। বাজার তার নিজস্ব শক্তি ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হবে।
কোনো শেয়ারের লেনদেন বা দরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেলে তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে এনে তদন্ত করা হবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো ব্রোকারেজ হাউসকে বাজার ওঠানো বা নামানোর জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে ফোন দেওয়া হচ্ছে না। ভবিষ্যতেও এমন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হবে না। বাজার বাড়লে বা কমলে সেটিকে বাজারের স্বাভাবিক গতির অংশ হিসেবেই দেখা হবে।
ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ে বড় উদ্যোগ
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ভালো ও মানসম্পন্ন কোম্পানি তালিকাভুক্তির পাশাপাশি পুঁজিবাজারের অবকাঠামো আধুনিকায়নে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মাসুদ খান।
ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের কাঠামো চালুর কাজ এগিয়ে চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) এবং সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডকে (সিসিবিএল) ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে বাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আসছে হাইব্রিড আইপিও
নতুন মূলধন সংগ্রহ এবং বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির সুযোগ একত্র করে ‘হাইব্রিড’ পদ্ধতিতে আইপিও চালুর বিষয়েও কাজ চলছে।
এ-সংক্রান্ত নতুন বিধি এক মাসের মধ্যে দেওয়া হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, আইপিও প্রক্রিয়ায় নতুন এ কাঠামো চালু হলে কোম্পানির মূলধন সংগ্রহ এবং বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে আরও নমনীয়তা তৈরি হতে পারে।
বছরের শেষ নাগাদ টি+১ চালুর লক্ষ্য
লেনদেন নিষ্পত্তির সময় কমিয়ে টি+১ সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগের কথাও জানান মাসুদ খান।
এ বিষয়ে ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। বছরের শেষ নাগাদ টি+১ চালুর চেষ্টা থাকবে বলে জানান তিনি।
এক মাসের মধ্যে পুনর্গঠন হতে পারে সিসিবিএল বোর্ড
সিসিবিএলের কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বোর্ড পুনর্গঠন করা হতে পারে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান।
তার মতে, আধুনিক পুঁজিবাজারে লেনদেনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় কাউন্টারপার্টি ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থিতিশীলকরণ তহবিলেও পরিবর্তন
পুঁজিবাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিলের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানান মাসুদ খান।
আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এসব উদ্যোগের সুফল পাওয়া যেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর প্রস্তুতি
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর প্রস্তুতিও চলছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান।
একই সঙ্গে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ওপর ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি এবং আকস্মিক পরিদর্শন অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
বিদেশি বিনিয়োগ ফেরাতে কাঠামোগত সংস্কার
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর ওপরও গুরুত্ব দেন মাসুদ খান।
তিনি বলেন, বাজারে কাঠামোগত সংস্কার, ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তি এবং আধুনিক অবকাঠামো গড়ে উঠলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরবে।
তার মতে, শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল ও সিসিবিএলসহ বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
সামনে বড় পরীক্ষা বাস্তবায়নের
বিএসইসি চেয়ারম্যানের বক্তব্যে পুঁজিবাজার উন্নয়নে একাধিক সংস্কারের পরিকল্পনা উঠে এসেছে। এর মধ্যে ডাইরেক্ট লিস্টিং, হাইব্রিড আইপিও, টি+১ সেটেলমেন্ট, সিসিবিএল বোর্ড পুনর্গঠন, স্থিতিশীলকরণ তহবিলে পরিবর্তন, ডেরিভেটিভস মার্কেট চালু এবং ঝুঁকিভিত্তিক সারভিলেন্স জোরদারের মতো উদ্যোগ রয়েছে।
তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে বাজারকে স্বাভাবিক গতিতে চলার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন এখন বিএসইসির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাজারসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ঘোষিত উদ্যোগগুলো বাস্তবে দৃশ্যমান হলে দেশের পুঁজিবাজার আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব হয়ে উঠবে।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।