২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের পুঁজিবাজারের জন্য বড় ধরনের কোনো তাৎক্ষণিক আর্থিক প্রণোদনা না থাকলেও বাজারের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং তারল্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজার আরও আধুনিক, কার্যকর ও বিনিয়োগবান্ধব হয়ে উঠতে পারে।
তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমানোর প্রস্তাব
প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য অন্যতম বড় সুবিধা হিসেবে করহার হ্রাসের ঘোষণা এসেছে। যেসব কোম্পানির অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে, তাদের করহার বর্তমান ২২.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
একই সঙ্গে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২৭.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এ সুবিধা পেতে সব ধরনের লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। ফলে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে ৫ শতাংশ কর ব্যবধান বহাল থাকছে, যা নতুন কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত করতে পারে।
আসছে T+0 সেটেলমেন্ট
বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে লেনদেন নিষ্পত্তির সময় বর্তমানের T+2 ব্যবস্থা থেকে পর্যায়ক্রমে T+0 ব্যবস্থায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে।
বর্তমানে কোনো শেয়ার বিক্রির পর অর্থ পেতে কয়েক কার্যদিবস অপেক্ষা করতে হয়। T+0 চালু হলে একই দিনে লেনদেন নিষ্পত্তি হবে এবং বিনিয়োগকারীরা দ্রুত অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। এতে বাজারে তারল্য বৃদ্ধি পাবে এবং লেনদেনের গতি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিজিটাল IPO প্ল্যাটফর্ম
নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বচ্ছ করতে ইউনিফাইড ডিজিটাল IPO প্ল্যাটফর্ম চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আবেদন, নথি যাচাই, অনুমোদন এবং ফি পরিশোধসহ পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করা যাবে। ফলে সময় কমবে, প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস পাবে এবং নতুন উদ্যোক্তারা সহজে বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাবেন।
বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণে গুরুত্ব
দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে করপোরেট বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাজেটে মিউনিসিপ্যাল বন্ড, সুকুক এবং অবকাঠামো তহবিলের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প অর্থায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হবে এবং পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগ পণ্যের সংযোজন ঘটবে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সুবিধা
প্রবাসী ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য NITA (Non-Resident Investors’ Taka Account) পরিচালনা আরও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগের মুনাফা ও শেয়ার বিক্রির অর্থ মাত্র এক কার্যদিবসের মধ্যে নিজ দেশে পাঠাতে পারবেন। এতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ
পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আনতে পেনশন ফান্ড, বীমা কোম্পানি এবং মিউচুয়াল ফান্ডের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যক্তিনির্ভর বাজারের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়লে বাজারে অস্থিরতা কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হবে।
জবাবদিহিতা ও সুশাসন জোরদার
বাজেটে অডিটর, ভ্যালুয়্যার এবং ইস্যু ম্যানেজারদের জন্য ‘প্রফেশনাল লায়াবিলিটি ফ্রেমওয়ার্ক’ ও বাধ্যতামূলক দায়বদ্ধতা বীমা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর ফলে ভুল বা বিভ্রান্তিকর আর্থিক তথ্য প্রদানের ঝুঁকি কমবে এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ আরও সুরক্ষিত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দ্বৈত তালিকাভুক্তির সুযোগ
দেশীয় কোম্পানিগুলোকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে দ্বৈত তালিকাভুক্তির সুযোগ অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশীয় কোম্পানিগুলো বিদেশি মূলধন সংগ্রহের নতুন সুযোগ পাবে।
পরোক্ষভাবে বিনিয়োগ সক্ষমতা বৃদ্ধি
সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ব্যক্তিগত সঞ্চয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা পরোক্ষভাবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এবারের বাজেটে তাৎক্ষণিক প্রণোদনার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমানো, T+0 সেটেলমেন্ট, ডিজিটাল IPO, বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ সহজীকরণের মতো উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজারে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে।
তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে, নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের পুঁজিবাজার একটি শক্তিশালী ও টেকসই অর্থায়ন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।