‘কাঁদা মাটি করিয়া শাসন, কুম্ভকার গড়ায় মাটির বাসন।
রৌদ্রে শুকাইয়া আগুনে পুড়াইয়া তাহাতে শিখাইয়াছে করিতে ‘রন্ধন।’
তখন থেকেই সভ্যতার প্রথম আগমন। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্প হলো মৃৎশিল্প। অনেকের মতে এটি শুধু শিল্প নয়, আবহমান গ্রাম-বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য।
আমি আজ কোনো মিষ্টির দোকানের গল্প বলবো না। তাদের কথা বলবো, যারা সন্দেশকে করে তোলেন দৃষ্টিনন্দন। তারা হলেন সেই অনামী শিল্পীরা, যারা সৃষ্টি করেন সন্দেশের ছাঁচ। কোনো খাবার জিনিষ শুধু খেতে ভালো হলে হয় না, দেখতে সুন্দর না হলে, ষোলকলা পূর্ণ হয় না। একটা সময় ছিল, যখন বাংলার ঘরে ঘরে মা বোনেরা বানাতেন নারকেল সন্দেশ,বিভিন্ন রকমের ডালের ও বিভিন্ন ধরনের সবজির সন্দেশ, ক্ষীরের বা ছানার সন্দেশ। তাদের হাতের অবসর সময়টা ওনারা ব্যাবহার করতেন বিভিন্ন গার্হস্থ্য শিল্পকলায়। এরমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছিল এই ছাঁচশিল্পের। এখানে তারা ফুটিয়ে তুলতেন, বিভিন্ন সামাজিক ঘটনাকে। পরবর্তীকালে, এই ছাঁচের ব্যাবহার শুরু হয় মিষ্টির দোকানে। বিভিন্ন সামাজিক রীতিনীতি, সামাজিক ঘটনা, চরিত্র খোদিত হতো এই ছাঁচে। বিয়ের অনুষ্ঠানে গোটা মাছের সন্দেশ, গায়ে-হলুদ এবং ফুলশয্যার সন্দেশ তো এখনো ব্যাবহার হয়। এছাড়াও জামাইষষ্ঠী, ভাইফোঁটা সন্দেশ তো আছেই! এসেছে বিভিন্ন পশু-পাখির ছাঁচ। বিভিন্ন সন্দেশের ছাঁচ হয়ে উঠেছিল।
মিষ্টির দোকানে এর ব্যাবহার দেখা গেলেও, এর জন্ম হয়েছিল কিন্তু বাংলার একেবারে অন্দরমহলে। যখন রসগোল্লা, মিষ্টি, ছাড়া আবিষ্কার হয় নি তখন মানুষ সন্দেশ খেতো তখন এই ছাঁচ এর জন্ম হয়েছিল! সন্দেশ এর মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে ছাঁচে। ছাঁচ তিন ধরণের হয়… মাটির, পাথরের আর কাঠের। ১৮০০ শতকের মাঝের দিক থেকে, ব্যাবহার হতে থাকে এই ছাঁচ।এরপর এলো স্বাধীনতা সংগ্রামের যুগ। সেই সংগ্রামের বীজ অঙ্কুরিত হলো এই ছাঁচের মধ্যেও। বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে গোপনে বিক্রি হতে লাগলো ‘বন্দেমাতরম’ সন্দেশ। এখনো আমরা দেখি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতীকের সন্দেশ বিক্রি হয়।এইভাবেই বিভিন্ন সন্দেশের ছাঁচ হয়ে উঠেছিল, সেই সময়ের সমাজের এক সমান্তরাল দর্পণ। সেই প্রথা আজও বর্তমান।এই ‘বন্দেমাতরম’ ছাঁচ থেকে আমি অনুপ্রেরণিত হয়ে সৃষ্টি করেছি, “জয় বাংলা ” ছাঁচ যা আমাদের বাংলাদেশে সর্ব প্রথম রাজনৈতিক প্রথম ছাঁচ।
বাঙালির সংস্কৃতির এক অবিচ্ছিন্ন অংশ মৃৎশিল্প। তাঁর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সন্দেশ ছাঁচ। সন্দেশের সৌন্দর্য নকশায়! ছাঁচে তোলা প্রত্ন ফলক-মূর্তি গুলি তার প্রমাণ। খাদ্যবস্তুকে কেন্দ্র করে রূপ সজ্জাটিও বড়ো বিচিত্র। একদিকে নকশা-চিত্র আর অন্য দিকে খাদ্যবস্তু; এই দু’য়ের মেলবন্ধন হল নকশা কাটা সন্দেশ ছাঁচ। এই ছাঁচে ঢেলে তৈরি হয় সন্দেশ, হালুয়া, পিঠা,নাড়ু,বিস্কুট। বিবাহ অনুষ্ঠান এবং লোক উৎসব গুলিকে সমবেত ভাবে সাজিয়ে তুলতে; আর সম্মানীয় অতিথি ও প্রিয় আপনজনদের আপ্যায়নের কথা ভেবেই এ ছাঁচগুলি তৈরি।যা আজ দুর্লভ। সন্দেশ চাহিদা রয়েছে তুঙ্গে। আমি সন্দেশ ছাঁচ নিয়ে যখন কাজ শুরু তখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে সন্দেশের ছাঁচের অনুলিপি সংগ্রহ করেছি। আমার কাছে ৫৬ টি সন্দেশ ছাঁচ আছে, তার প্রতিটিই বহু বছর পুরনো, ৫০-৭৫-৮০-৯০-১৫০ বছরে পুরনো। ছাঁচ সংগ্রহ করার সময় বুঝতে পেরেছি এ দেশের গ্রামের নারীদের মধ্যে কত বড় শিল্পীমন বিরাজ করে এবং তাঁরা মনের কত গভীর থেকে সন্দেশের ছাঁচ নির্মাণ করেন বা করতেন।’ বাংলার নানা জেলায় বিভিন্ন রকমের সন্দেশের ইতিহাস বাংলার নিজস্ব সম্মান, গর্ব।

মাটির সন্দেশ ছাঁচ তৈরী হয়, খোদাই করে। কিন্তু মাটির ছাঁচ বানানোর পদ্ধতিটা একটু অন্যরকম। প্রথমে উপযুক্ত মাটি পরিমাণ মতো নিয়ে, ছাঁচ এর আকৃতি দিয়ে, খোদাই করে ছাঁচের ডিজাইনটা বানিয়ে নিতে হয়। এরপর সেটাকে রোদে শুকিয়ে,তার উপর আরেক দফা অন্য একটা মাটির প্রলেপ চাপিয়ে, শুকিয়ে নেওয়া হয়। এই শুকনো ছাঁচ এবার আগুনে পুড়িয়ে নেওয়া হয়। আর এই পোড়ানোর জন্য সবথেকে উপযুক্ত হলো, ধানের তুসের আগুন। ছাঁচের রং ঘন কালো করার জন্য, নিভু নিভু আগুনে এগুলোকে প্রায় ১২ ঘন্টা পর্যন্ত ফেলে রাখাও হয়। ভাবলে অবাক লাগে, একটা ছাঁচের পিছনে একজন শিল্পী কত পরিশ্রম লুকিয়ে থাকে।
প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে ঐতিহ্যবাহী মাটির ছাঁচের ব্যবহার কমে গেছে অনেকাংশে। এ শিল্পের জায়গা দখল করে নিয়েছে প্লাস্টিকসহ অন্যান্য সামগ্রী। এগুলো স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। তবু এগুলো ব্যবহার হচ্ছে অবলীলায়। সুন্দর সুস্থ জীবন নিয়ে বাঁচতে হলে মাটিতে ফিরে আসতে হবে আমাদের।
প্রাকৃতিক নির্ভেজাল এই পণ্য কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে। আসুন নিজেদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য মৃৎশিল্প এর ব্যবহার বাড়াতে হবে।
Author
-
সমাজকর্মী, উদ্যোক্তা ও মৃৎকারিগর প্রচার ও গণমাধ্যম সম্পাদক বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বরিশাল জেলা শাখা
View all posts