অর্থ লিপি

৩০ জুলাই ২০২৬ বৃহস্পতিবার ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

শেয়ার বাজারকে মাফিয়া ও দুর্নীতিবাজ মুক্ত করতে হবে

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “অর্থ লিপি.কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  www.facebook.com/OrthoLipi

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রদের প্রবল গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন। এর পরপর দেশের পুরো দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন শিবলী রুবাইয়াত জনরোষের ভয়ে ৯ আগস্ট পদত্যাগ করেছেন।

বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের মেয়াদে শেয়ার বাজারে ব্যাপক লুটতরাজ হয়েছে। তার সঙ্গে যোগসাজশ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন দেশের প্রভাবশালী গ্রুপের মালিকেরা।

বাজারে লাগামহীন কারসাজি করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পথে বসিয়ে দিয়েছেন শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের ঘনিষ্ট চক্র। পর্ষদ পুনর্গঠনের নামে বিভিন্ন কোম্পানিতে নিজের ঘনিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচালক হিসেবে বসিয়ে নতুন ভাবে লুটপাটের সুযোগ করে দেওয়া, ব্যবসা না করতে পেরে বন্ধ হয়ে যাওয়া কোম্পানিকে নিজের লোকদের হাতে তুলে দিয়ে সেগুলোকে পুনরায় বাজারে নিয়ে এসে বিনিয়োগকারীদের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেন তিনি।

তার বিরুদ্ধে টাকা পাচার এবং পাচারকারীদের সহায়তা করারও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল এর আড়ালে টাকা পাচারের সুযোগ করে দেওয়া। এসব সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিতেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হতেন এক ঝাঁক ব্যবসায়ী, আমলা ও রাজনৈতিক নেতা। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের কোনো লাগেজ বিমানবন্দরে কাস্টমস পরীক্ষা করে না। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে লাগেজে করে ক্যাশ ডলার পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে পুঁজিবাজারে যেসব কোম্পানির শেয়ার নিয়ে সবচেয়ে বেশি কারসাজি হয়েছে, সেসব কোম্পানি বা তার উদ্যোক্তারা এসব রোডশো স্পন্সর করেছেন। শিবলী রুবাইয়াতের উদ্যোগে সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে রোডশো বা বিনিয়োগ সম্মেলন হয়েছে।

শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম পুঁজিবাজারে যেসব মধ্যবর্তী প্রতিষ্ঠানের (Intermidiaries) লাইসেন্স দিয়েছেন, সেগুলো নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাজারকে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর মনে করা হয়। এ বাজার পুরোটাই আস্থার উপর চলে। এ কারণে বাজার সংশ্লিষ্ট কোনো লাইসেন্স দেওয়ার আগে আবেদনকারীর যোগ্যতা, তার ভাবমূর্তি, অতীত রেকর্ড খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়।

কিন্তু এখানে লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বেশিরভাগ লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে আওয়ামীলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং তার নিজের ঘনিষ্ট ব্যক্তিদের। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে আর্থিক অপরাধের জন্য শাস্তিপ্রাপ্ত তার বন্ধু জাভেদ মতিন এবং দেশের শেয়ারবাজারে একাধিক কারসাজিতে অভিযুক্ত গেমলার হিরোর স্ত্রীকে ব্রোকার হাউজের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

মুখে বাজারে অনেক সংস্কার এবং বিদেশী বিনিয়োগ আনার চেষ্টার কথা বললেও বাজারের অবস্থা দিন দিন খারাপ হয়েছে। বাজারে নতুন কোনো বিদেশী বিনিয়োগ আসেনি। বরং বিদ্যমান বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে টানা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছে।

বর্তমানে পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ স্মরণকালের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে আছে। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ফ্লোর প্রাইস নামের কৃত্রিম ব্যবস্থায় বাজারের পতন ঠেকিয়ে রাখতে হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের মতো দেশের পুঁজিবাজারে মূল্যসূচকের বড় উল্লম্ফন হয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশে পুরো বিপরীত অবস্থা। গত জুলাই মাস পর্যন্ত বাজারে বড় দর পতন হয়েছে। জুলাই মাসে সূচকের অবস্থা ২০২২ সালেরও নিচে ছিল। আর এর পুরো দায় শিবলী রুবাইয়াতের প্রশ্রয়ে চলা লাগামহীন কারসাজি ও লুটপাট। তাই বিনিযোগকারীসহ স্টেক হোল্ডাররা তার উপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ।

পুঁজিবাজারে অনেক আইন-কানুন, বিধি-বিধান প্রণয়ন হলেও অনেক ক্ষেত্রেই এর প্রয়োগে ছিল বেশ ঘাটতি। বিশেষ করে খায়রুল কমিশনের মেয়াদে আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে দুর্বল ও মানহীন কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার অভিযোগ রয়েছে। এ সময় প্রভাবশালী উদ্যোক্তা, ইস্যু ব্যবস্থাপক, নিরীক্ষক এবং এক শ্রেণীর বিনিয়োগকারীর সমন্বয়ে একটি বড় কারসাজি চক্র গড়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রেই আইনের ফাঁক-ফোকর কিংবা ছাড় দিয়ে সহযোগীর ভূমিকায় ছিলেন খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা।

গত ১৪ বছর ধরে পুঁজিবাজার বেশ খারাপ । সুশাসন নেই, ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি, শেয়ারদরে কারসাজি হয়েছে, ফ্লোর প্রাইস দেয়ার মাধ্যমে ভালো কোম্পানির লেনদেন একপ্রকার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন পর্যন্ত বাজে শেয়ারের মাধ্যমে কারসাজি চলছে। প্রচুর আইন থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই এর প্রয়োগ হয়নি। এ কারণে পুঁজিবাজারের প্রতি মানুষের আস্থা চলে গেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনেক ধরনের অনিয়ম করেছে, অনেককে সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে, কারসাজির বিরুদ্ধে যথাযথভাবে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

বর্তমানে দেশের অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই খারাপ অবস্থায় আছে। তার ওপর গত এক-দেড় মাসের ঘটনা আরো বড় ধাক্কা খেয়েছে। এটির প্রভাব কত দিনে কাটিয়ে উঠতে পারবে সেটি একটি প্রশ্ন। অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার রাতারাতি ভালো হয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা করা উচিত নয়। এক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগবে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর  কয়েকদিনে পুঁজিবাজারে যে ঊর্ধ্বমুখিতা দেখা গেছে সেটি কতটুকু যৌক্তিক কারণে আর কতটুকু আবেগের কারণে বেড়েছে সেটি সময়ই বলে দেবে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সংস্কারের দাবি তুলেছেন সর্বস্তরের লোকজন। পাশাপাশি দেশের শেয়ার বাজারকে গতিশীল করতে সংস্কার চাইছেন সবাই।শেয়ার বাজারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শেয়ার বাজারকে বাজারকে মাফিয়া ও দুর্নীতিবাজ মুক্ত করতে হবে।

Author

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন
শেয়ার বাজার

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।