বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আচরণ বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসে, গুজবনির্ভর সিদ্ধান্ত এখনো বড় একটি বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মৌলভিত্তি বিশ্লেষণের চেয়ে “শুনেছি বাড়বে” বা “অনেকে কিনছে” এমন মনোভাবেই লেনদেনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ফলে বাজারে অস্বাভাবিক ওঠানামা, হঠাৎ দাম বৃদ্ধি কিংবা পতনের প্রবণতা তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে টেকসইভাবে টিকে থাকতে হলে কোম্পানির মৌলিক শক্তি মূল্যায়ন করা অপরিহার্য। একটি প্রতিষ্ঠানের আয় (Earnings), নগদ প্রবাহ (Cash Flow), ঋণ পরিস্থিতি, করপোরেট সুশাসন এবং সংশ্লিষ্ট খাতের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা, এসব বিষয় বিবেচনায় না এনে শুধুমাত্র গুজব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যে নির্ভর করা বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে খুচরা বিনিয়োগকারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এদের একটি বড় অংশ স্বল্পমেয়াদি লাভের আশায় ট্রেডিংয়ে বেশি আগ্রহী। কিন্তু পর্যাপ্ত জ্ঞান ও বিশ্লেষণ ছাড়া এই ট্রেডিং অনেক সময় লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে “পাম্প অ্যান্ড ডাম্প” ধরনের কৌশলের শিকার হয়ে অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের ফলে এখন তথ্য পাওয়া সহজ হলেও সঠিক তথ্য বাছাই করা বড় চ্যালেঞ্জ। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ফেসবুক গ্রুপ বা বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে প্রভাবিত হয়ে বিনিয়োগ করলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি থাকে।
অন্যদিকে, দক্ষ বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোন। তারা কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেন, শিল্পখাতের প্রবণতা বোঝার চেষ্টা করেন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেন। তাদের কাছে বাজারের সাময়িক ওঠানামা নয়, বরং টেকসই প্রবৃদ্ধিই মুখ্য বিষয়।
বাজার বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষার উন্নয়ন এবং সচেতনতা বৃদ্ধি না হলে গুজবনির্ভর লেনদেন পুরো বাজারের স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্রোকারেজ হাউজ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, শেয়ারবাজারে সফলতা কোনো শর্টকাটের বিষয় নয়। গুজবের পেছনে ছুটে সাময়িক লাভ পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান, বিশ্লেষণ এবং ধৈর্যই হতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি।