সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই বড় ধাক্কা খেল দেশের শেয়ার বাজার।
আজ রোববার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক DSEX একদিনে ১০৩.৬৪ পয়েন্ট বা ১.৮৩ শতাংশ কমে ৫,৫৫৮.৪৫ পয়েন্টে নেমে এসেছে।
সূচকের এই শতাধিক পয়েন্ট পতন নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। তবে শুধু সূচকের পতন দিয়ে বাজারের পুরো চিত্র ব্যাখ্যা করা যাবে না। আজকের বাজারে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়েছে, তা হলো ব্যাপক বিক্রিচাপ, দুর্বল অংশগ্রহণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি।
আজ ডিএসইতে মোট ৩৮৯টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪৮টির দর কমেছে, বেড়েছে মাত্র ২০টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ২১টি। অর্থাৎ বাজারের পতনটি ছিল প্রায় সর্বব্যাপী। একই সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণ নেমে এসেছে ৫৪৫ কোটি ২৭ লাখ টাকায়, যা আগের কার্যদিবসের ৭২০ কোটি ৯২ লাখ টাকার তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ কম।
শুধু DSEX নয়, আজ শরিয়াহভিত্তিক DSES সূচকও ২২.৬৫ পয়েন্ট বা ১.৯৯ শতাংশ কমে ১,১১৫.৩৬ পয়েন্টে এবং DS30 সূচক ২৪.৫৩ পয়েন্ট বা ১.১৫ শতাংশ কমে ২,১১৬.২০ পয়েন্টে নেমেছে। অর্থাৎ বাজারের দুর্বলতা কোনো একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির শেয়ারে সীমাবদ্ধ ছিল না।
পতনের চেয়ে বড় প্রশ্ন আস্থার
সূচকের পতনে ‘সেঞ্চুরি’ নিঃসন্দেহে উদ্বেগের সংকেত। কিন্তু বর্তমান বাজারের মূল সমস্যা শুধু সূচকের অবস্থান নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা।
গত কয়েক সপ্তাহের বাজারচিত্রেও তারল্য ও অংশগ্রহণের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। আগস্টের শেষদিকে এক পর্যায়ে ডিএসইর দৈনিক লেনদেন ৫০০ কোটি টাকার নিচে নেমে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কিছুটা লেনদেন বাড়লেও বাজারে স্থায়ী ও ব্যাপকভিত্তিক ক্রয়চাহিদা তৈরি হয়নি।
ফলে আজকের মতো বড় পতনের দিনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ‘কে আগে বিক্রি করবে’ ধরনের মানসিকতা তৈরি হলে পতন দ্রুত তীব্র হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে নতুন অর্থের প্রবাহ কমে যাওয়া, বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিনিয়োগকারীদের দ্বিধা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
কৃত্রিমভাবে সূচক ধরে রাখা কোনো সমাধান নয়
এই পরিস্থিতিতে সরকারের আশু পদক্ষেপ প্রয়োজন, তবে সেই পদক্ষেপের লক্ষ্য হওয়া উচিত সূচককে কৃত্রিমভাবে বাড়ানো বা ধরে রাখা নয়।
বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা-জোগান ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অযাচিত হস্তক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য আরও ক্ষতিকর হতে পারে। একইভাবে কৃত্রিমভাবে বাজারকে ঊর্ধ্বমুখী করার উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর পরিবর্তে বাজারের প্রকৃত শক্তি ও দুর্বলতাকে আড়াল করবে।
সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব হলো বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য একটি স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও ন্যায়সংগত পরিবেশ নিশ্চিত করা।
কারসাজি, গুজব, অস্বাভাবিক লেনদেন, কৃত্রিমভাবে দর বাড়ানো-কমানো এবং বাজারের স্বাভাবিক মূল্য আবিষ্কার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিকে বাজারে আনা, কর্পোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা, তথ্য প্রকাশের মান উন্নত করা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এখন প্রয়োজন আস্থা ফেরানোর রোডম্যাপ
শেয়ারবাজারকে শুধু সূচক দিয়ে বিচার করলে সমস্যার গভীরে যাওয়া যাবে না। আজকের ১০৩ পয়েন্টের পতন আমাদের সামনে আবারও সেই পুরোনো প্রশ্নটি তুলে ধরেছে: বিনিয়োগকারীরা কেন বাজারে নতুন অর্থ নিয়ে আসতে আস্থা পাচ্ছেন না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে
সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকার-ডিলার, মার্চেন্ট ব্যাংক, অ্যাসেট ম্যানেজার এবং অন্যান্য বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রয়োজন হলে একটি সুস্পষ্ট Capital Market Recovery Roadmap ঘোষণা করা যেতে পারে, যেখানে থাকবে স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা।
শেয়ারবাজারে স্থায়ী সমাধান আসে না কৃত্রিমভাবে সূচক ধরে রাখার মাধ্যমে। আসে আস্থা, স্বচ্ছতা, সুশাসন, জবাবদিহিতা, ভালো কোম্পানি এবং শক্তিশালী মৌলভিত্তির মাধ্যমে।
তাই আজকের শতাধিক পয়েন্টের পতনকে শুধু আতঙ্কের কারণ হিসেবে না দেখে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা উচিত।
বাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। তবে কারসাজি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে থাকতে হবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ।
কৃত্রিমভাবে বাজার বাড়ানো যেমন চাই না, তেমনি বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা-জোগান ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অযাচিত হস্তক্ষেপও বন্ধ করতে হবে।
এখন প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা।
কারণ একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সম্পদ সূচক নয়, বিনিয়োগকারীর আস্থা।