বন্ধ ও স্থবির কারখানায় আবারও উৎপাদনের চাকা ঘোরাতে বড় অঙ্কের অর্থায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণে ১৭টি ব্যাংক ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ বিতরণ শুরু হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ কলকারখানা চালু এবং অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা বিতরণে ব্যাংকগুলো সম্মতি দিয়েছে। এই অর্থ দেশের মোট ৩৭টি ব্যাংকের মাধ্যমে উৎপাদন খাতে ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে।
গড়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো গড়ে ৭ শতাংশ সুদে গ্রাহকদের ঋণ দেবে। বিশেষ করে বন্ধ বা স্থবির উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় সচল করার লক্ষ্যেই এই অর্থায়ন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, উৎপাদন খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়লে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু হবে, বাড়বে উৎপাদন এবং একই সঙ্গে তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। এতে স্থবির অর্থনীতিতেও গতি ফিরবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আবেদন বাড়ছে, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ যাচাই-বাছাই
স্বল্প সুদের এই ঋণ পেতে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ইতোমধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক জানিয়েছে, এ সুবিধা নিতে অনেকেই আবেদন করছেন।
তবে অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, শুধু অর্থায়ন করলেই বন্ধ কারখানা চালু হবে না। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট, গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহ, কাঁচামালের উচ্চমূল্যসহ যেসব কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ বা স্থবির হয়ে পড়েছে, সেসব সমস্যার সমাধান না করে নতুন করে ঋণ দেওয়া হলে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো কারখানা কেন বন্ধ হয়েছে, বর্তমানে তার উৎপাদন সক্ষমতা কতটুকু, বাজারে পণ্যের চাহিদা কেমন, উদ্যোক্তার নিজস্ব বিনিয়োগ কত এবং প্রতিষ্ঠানটি ঋণ পরিশোধে সক্ষম কি না, এসব বিষয় ভালোভাবে যাচাই করেই অর্থ ছাড় করা প্রয়োজন।
খেলাপি ঋণের ঝুঁকি এড়াতে কঠোর নজরদারির দাবি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে বিভিন্ন প্রণোদনা ও পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাই নতুন এই তহবিলের অর্থ যেন প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতে যায়, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ঋণ বিতরণ ও অর্থের ব্যবহার একটি বিশেষ ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে নজরদারি করা হবে। এতে অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরিদর্শনও প্রয়োজন। কারণ কাগজে-কলমে একটি প্রতিষ্ঠান চালু থাকার তথ্য থাকলেও বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে কি না, সেটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অর্থায়ন চান বিশ্লেষকরা
প্রণোদনা তহবিলের অর্থ বিতরণে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের সুযোগ না রাখারও পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যোগ্যতা ও ব্যবসায়িক সক্ষমতার ভিত্তিতে ঋণ বিতরণ করতে না পারলে এই উদ্যোগ অর্থনীতিকে চাঙা করার পরিবর্তে ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে নতুন খেলাপি ঋণের বোঝা তৈরি করতে পারে।
অর্থলিপির বিশ্লেষণ:
বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু হলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকের আটকে থাকা ঋণও আদায়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু জ্বালানি সংকট ও ব্যবসায়িক সমস্যার মূল কারণগুলো অমীমাংসিত রেখে শুধু নতুন ঋণ দিয়ে পুরোনো সংকট ঢাকার চেষ্টা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে সুফলের বদলে ব্যাংকিং খাতের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ‘ঋণ বিতরণ’ নয়, ‘ঋণের সঠিক ব্যবহার ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করাই’ এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।