অর্থ লিপি

১৮ অক্টোবর ২০২৬ রবিবার ২ কার্তিক ১৪৩৩

কোম্পানির মুনাফার অন্তত ৫০% লভ্যাংশ বিতরণের বাধ্যবাধকতা চান বিনিয়োগকারীরা

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “অর্থ লিপি.কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  www.facebook.com/OrthoLipi

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অর্জিত মুনাফার অন্তত ৫০ শতাংশ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তাঁদের মতে, কোম্পানি মুনাফা অর্জন করলেও তার সুফল থেকে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা যেন বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, কিছু তালিকাভুক্ত কোম্পানি শেয়ারপ্রতি ১৮ থেকে ১৯ টাকা পর্যন্ত মুনাফা অর্জন করেও মাত্র ১ থেকে ২ টাকা লভ্যাংশ দেয়। আবার কোনো কোনো কোম্পানি শেয়ারপ্রতি ৯ থেকে ১০ টাকা মুনাফা করেও মাত্র ১ টাকা লভ্যাংশ ঘোষণা করে। ফলে কোম্পানির আয় ও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে মুনাফা বণ্টনের অনুপাত নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কিছু বিদেশি কোম্পানির মোট মুনাফার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণের নজির রয়েছে বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, এসব উদাহরণ বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ নীতি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এ বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত।

মুনাফা বেশি, লভ্যাংশ কম: প্রশ্ন বিনিয়োগকারীদের

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন, কোম্পানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুনাফা অর্জন করার পরও কেন তার তুলনায় সামান্য অংশ লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ করবে? মুনাফার বড় অংশ সংরক্ষণ করা হলে সেই অর্থ কোথায়, কী উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা শেয়ারহোল্ডারদের কাছে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা উচিত।

ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ, প্রযুক্তির উন্নয়ন, ঋণ পরিশোধ কিংবা কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজন মেটাতে মুনাফার একটি অংশ সংরক্ষণ করা যৌক্তিক হতে পারে। কিন্তু সংরক্ষিত অর্থের সুনির্দিষ্ট ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু কোম্পানির মুনাফার পরিমাণ নয়, সেই মুনাফা কীভাবে বণ্টন করা হচ্ছে এবং অবশিষ্ট অর্থের ব্যবহার কতটা কার্যকর, সেটিও মূল্যায়নের আওতায় আনা প্রয়োজন।

বছরের পর বছর একই হারে লভ্যাংশ, মুনাফার পরিবর্তনের প্রতিফলন কোথায়?

বাজারসংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কিছু তালিকাভুক্ত কোম্পানি টানা ১০ বছর ধরে একই হারে লভ্যাংশ দিয়ে আসছে। এ সময়ে কোম্পানির মুনাফা বাড়ুক বা কমুক, লভ্যাংশের হার প্রায় অপরিবর্তিত থাকছে।

তবে ধারাবাহিকভাবে একই হারে লভ্যাংশ দেওয়াই যে অনিয়ম, তা নয়। কোনো কোম্পানির আয় ও নগদ প্রবাহ স্থিতিশীল থাকলে অথবা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

কিন্তু কোম্পানির মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পরও লভ্যাংশের হার অপরিবর্তিত থাকলে তার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিনিয়োগকারীদের একাংশ। তাঁদের মতে, লভ্যাংশ নীতিতে কোম্পানির আয়, নগদ প্রবাহ, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ এবং শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থের মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা উচিত।

আর্থিক প্রতিবেদন ও অডিটের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ

বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও অডিটের বিশ্বাসযোগ্যতা। বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, আর্থিক অনিয়মের ক্ষেত্রে কার্যকর তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।

তাঁদের আশঙ্কা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে প্রকাশিত হিসাবের অসামঞ্জস্য থাকতে পারে। এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন অডিট, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকি এবং প্রয়োজন হলে ফরেনসিক অডিটের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে এমন উদ্বেগও রয়েছে যে, কোনো কোম্পানি ভালো মুনাফার বছরে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে ইচ্ছাকৃতভাবে লোকসান দেখালে, সেই সংরক্ষিত অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোম্পানির আর্থিক নথি, অডিট প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণ যাচাই ছাড়া কোনো অনিয়মকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

তাঁদের মতে, সংরক্ষিত মুনাফা, রিজার্ভ, নগদ অর্থের প্রবাহ এবং পরবর্তী বছরের লোকসানের কারণ যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিনিয়োগকারীরা পরিষ্কার ধারণা পাবেন।

আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহি চান বাজারসংশ্লিষ্টরা

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, আর্থিক প্রতিবেদনে ইচ্ছাকৃত ভুল তথ্য প্রদান, জালিয়াতি বা মুনাফা-লোকসানের তথ্য বিকৃত করার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি, দায়ী পরিচালক, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশে আর্থিক জালিয়াতির বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান একেবারেই নেই, এমন দাবি না করে বরং বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগ, তদন্তের গতি এবং শাস্তি নিশ্চিত করার সক্ষমতা পর্যালোচনা করা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

তাঁদের মতে, শুধু অনিয়ম শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। অভিযোগ তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে।

বিএসইসির কাছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দাবি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন তালিকাভুক্ত কোম্পানির মুনাফা ও লভ্যাংশ বিতরণসংক্রান্ত নীতিমালা পর্যালোচনা করে একটি সুস্পষ্ট কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নিক।

তাঁদের প্রস্তাব, কোম্পানির প্রকৃত ও নিরীক্ষিত মুনাফা এবং আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে অন্তত ৫০ শতাংশ মুনাফা লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণের একটি সাধারণ নীতিগত বাধ্যবাধকতা বিবেচনা করা যেতে পারে। যেসব কোম্পানি নির্ধারিত হারের চেয়ে কম লভ্যাংশ দেবে, তাদের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কারণ ব্যাখ্যা এবং সংরক্ষিত অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা প্রকাশের বিধান রাখার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।

এ ক্ষেত্রে কোম্পানির নগদ প্রবাহ, ঋণের পরিমাণ, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা, ব্যবসার প্রকৃতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, সব কোম্পানির ওপর নির্বিচারে একই হারে লভ্যাংশ বিতরণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিবেদন ও অডিটের মান নিশ্চিত করা, সংরক্ষিত মুনাফার ব্যবহার প্রকাশ করা এবং ইচ্ছাকৃত আর্থিক জালিয়াতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা শক্তিশালী করতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, মুনাফা বণ্টন ও অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অপরিহার্য। কোম্পানি মুনাফা করবে, অথচ সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা তার ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত হবেন, এমন পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের অসন্তোষ বাড়াতে পারে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, একটি ভারসাম্যপূর্ণ লভ্যাংশ নীতি, নির্ভরযোগ্য অডিট ব্যবস্থা, সংরক্ষিত মুনাফার ব্যবহারে স্বচ্ছতা এবং আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে পুঁজিবাজারের সুশাসন জোরদার হতে পারে।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মূল দাবি, কোম্পানির প্রকৃত মুনাফার ন্যায্য অংশ শেয়ারহোল্ডারদের দিতে হবে। আর ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক প্রয়োজনের কারণে মুনাফার কোনো অংশ সংরক্ষণ করা হলে তার যৌক্তিকতা ও ব্যবহার সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।

তাঁদের প্রত্যাশা, বিএসইসি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এমন নীতিমালা প্রণয়নে উদ্যোগী হবে, যা একদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করবে, অন্যদিকে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিও বজায় রাখবে। একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং প্রমাণিত অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আস্থা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।

Author

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।