ঈদুল আজহার ছুটি শেষে দেশের পুঁজিবাজারে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। গত সপ্তাহের চার কার্যদিবসেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে। সূচকের ধারাবাহিক উত্থান, লেনদেনের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাজারে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজার উন্নয়নে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, নিয়ন্ত্রক সংস্থায় সংস্কারের প্রত্যাশা এবং দীর্ঘদিন ধরে অবমূল্যায়িত অনেক শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধির ফলে বাজারে ইতিবাচক গতি ফিরে এসেছে।
সূচকে শক্তিশালী উত্থান
সপ্তাহজুড়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ২১১ পয়েন্ট বা প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে ৫,৪৭৫ পয়েন্টে পৌঁছেছে। একই সময়ে ডিএস-৩০ সূচক ৭৩ পয়েন্ট বেড়ে ২,০৬৮ পয়েন্ট এবং শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ৩৯ পয়েন্ট বেড়ে ১,১০৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৮৮টি কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড ও বন্ডের মধ্যে ৩২৮টির দর বেড়েছে, কমেছে মাত্র ৪৯টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ১১টির দর। এ চিত্র বাজারে ব্যাপক ইতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
লেনদেনে ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি
শুধু সূচক নয়, লেনদেনেও এসেছে বড় ধরনের গতি। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেন দাঁড়িয়েছে ১,১৫৬ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহের ৭৯৬ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে বাজারে তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও দৃশ্যমানভাবে ফিরে আসছে।
যেসব শেয়ার টেনেছে সূচক
গত সপ্তাহে সূচকের উত্থানে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, পূবালী ব্যাংক, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ এবং বিএসআরএম লিমিটেডের শেয়ার।
বিশ্লেষকদের মতে, মৌলভিত্তি শক্তিশালী ও তুলনামূলকভাবে কম মূল্যায়িত শেয়ারগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ায় এসব কোম্পানির শেয়ারে ক্রয়চাপ তৈরি হয়েছে।
সংস্কারের প্রত্যাশায় বাড়ছে আত্মবিশ্বাস
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় সম্ভাব্য কমিশন সংস্কার নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের প্রভাবও বাজারে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। বিনিয়োগকারীদের ধারণা, সংস্কার কার্যকর হলে বাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন আরও শক্তিশালী হবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং জাতীয় বাজেটকে ঘিরে কিছু উদ্বেগ থাকলেও বিনিয়োগকারীরা সেসব ঝুঁকি উপেক্ষা করে দীর্রমেয়াদি সম্ভাবনার দিকে নজর দিচ্ছেন।
খাতভিত্তিক লেনদেনে শীর্ষে প্রকৌশল
খাতভিত্তিক লেনদেনে গত সপ্তাহে প্রকৌশল খাত ছিল সবচেয়ে সক্রিয়। ডিএসইর মোট লেনদেনের ১৬.২ শতাংশ দখলে নিয়ে খাতটি শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
এরপর ওষুধ ও রসায়ন খাতের দখলে ছিল ১১.৯ শতাংশ, বস্ত্র খাতে ১১.৪ শতাংশ, ব্যাংক খাতে ১০.৯ শতাংশ এবং সাধারণ বীমা খাতে ৯.৭ শতাংশ লেনদেন।
রিটার্নের দিক থেকে সবচেয়ে ভালো করেছে সেবা ও আবাসন খাত, যেখানে ৮.৪ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে। এছাড়া কাগজ ও মুদ্রণ, সিমেন্ট, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সাধারণ বীমা খাতেও উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক রিটার্ন দেখা গেছে। নেতিবাচক রিটার্ন এসেছে শুধু পাট খাতে।
চট্টগ্রাম বাজারেও ইতিবাচক ধারা
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) গত সপ্তাহে ইতিবাচক প্রবণতা বজায় ছিল। সিএএসপিআই সূচক ২.৪ শতাংশ বেড়ে ১৫,২৬৮ পয়েন্টে এবং সিএসসিএক্স সূচক ২.৩ শতাংশ বেড়ে ৯,৩৮২ পয়েন্টে পৌঁছেছে।
সপ্তাহজুড়ে সিএসইতে ১৩৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের ৪৬ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। লেনদেন হওয়া ৩১৭টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৩৯টির দর বেড়েছে।
সামনের দিনের প্রত্যাশা
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখতে হলে সংস্কার কার্যক্রমের দৃশ্যমান অগ্রগতি, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে সূচক ও লেনদেনের সাম্প্রতিক উত্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের পুঁজিবাজার ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের পথে এগোচ্ছে।