নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে চলতি বছরের প্রথম দুই মাস জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের শেয়ারবাজারে সূচক ও লেনদেনের ঊর্ধ্বমুখিতা দেখা গিয়েছিল। এর পর থেকে শেয়ারবাজারে বড় দরপতন পরিলক্ষিত হয়েছে। সর্বশেষ মে মাসে ডিএসইর সার্বিক সূচক ডিএসইএক্স ৩৩২.৬৮ পয়েন্ট হারিয়েছে। তবে আলোচ্য মাসে এক্সচেঞ্জটির দৈনিক গড় লেনদেন বেড়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ। মূলত লোকসান এড়াতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বিক্রির প্রবণতার কারণে মে মাসে শেয়ারবাজারে নিম্নমুখিতা দেখা গেছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
গত ৩০ শে এপ্রিল শেষে ডিএসইএক্স সূচক ছিল ৫৫৮৪.৬৪ পয়েন্টে। মে মাসে সূচকটি ৩৩২.৬৮ পয়েন্ট বা ৬ শতাংশ কমে ৫২৫১.৯৬ পয়েন্টে এসে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ৩৮ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।

গত এক বছর ধরেই শেয়ারবাজারে লেনদেনের পরিমাণ নিম্নমুখী। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের শেয়ারবাজারে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক কড়াকড়ির কারণে মুদ্রাবাজারে ক্রমবর্ধমান সুদহার বাজারের দীর্ঘস্থায়ী দরপতন পুনরুদ্ধারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া আগামী অর্থবছরে মূলধনি আয়ের ওপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের করারোপের খবর বিনিয়োগকারীদের হতাশা বাড়িয়েছে। ফলে মাসজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বিক্রি করার প্রবণতা দেখা গেছে।
মে মাসে শেয়ারবাজারে বাজার মূলধন কমেছে ৯০৫ কোটি ডলার। গত এপ্রিলে বাজার মূলধন ছিল ৬ হাজার ৪১০ কোটি ডলার, যা মে মাসে ৫ হাজার ৫০৫ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ মাসে জিডিপি ও বাজার মূলধনের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১৩ শতাংশে, যা এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজারে মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) ১৩.৪৯।
দেশের জিডিপির অনুপাতে বাজার মূলধন নেমে এসেছে ১৩.৭৭ শতাংশে। যা ১ বছর আগেও ছিল ১৭.৪৩ শতাংশ। গত ১ বছরে এই অনুপাত কমেছে প্রায় ৩.৬৬ শতাংশ।
একটি দেশের শেয়ারবাজারের আকার কত বড় তা পরিমাপ করা হয় মূলত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সঙ্গে বাজার মূলধনের অনুপাতের মাধ্যমে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয় এ অনুপাত ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশের মধ্যে থাকে। উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর শেয়ারবাজারের আকার জিডিপির ৫০ শতাংশ থেকে প্রায় সমান হয়।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আমাদের দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সঙ্গে বাজার মূলধনের অনুপাতের হার খুবই নগন্য।
সার্বিকভাবে বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বিভিন্ন ইস্যুতে বাজারে পতন ত্বরান্বিত হচ্ছে। গত কয়েকমাস ধরে শেয়ারবাজারে মন্দাভাব চলছে। এ কারণে বাজার অনেকটাই প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। বাজারে নতুন বিনিয়োগ তো হচ্ছেই না, উলটো বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের অনেকে বাজার ছাড়ছেন। এ অবস্থায় বাজার নিয়ে চরম আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। সেই সঙ্গে চলছে শেয়ারের বিপরীতে দেওয়া মার্জিন ঋণ সমন্বয়ে জোরপূর্বক বিক্রি বা ফোর্সড সেল। আবার কখনো কখনো সেচ্ছায় মার্জিন ঋণ সমন্বয়।
উল্লেখ্য, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে মার্জিন ঋণ সুবিধা দেয় ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো। যখন বাজারে টানা পতন শুরু হয়, তখন শেয়ারের দাম নির্দিষ্ট একটি সীমার নিচে নেমে গেলে মার্জিন ঋণ সমন্বয়ে ঋণগ্রহীতার শেয়ার বিক্রি করে দেয় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। শেয়ারবাজারে এটিই ফোর্সড সেল হিসেবে পরিচিত।
সম্প্রতি শেয়ার বাজারের দরপতন ঠেকাতে শেয়ারের দাম এক দিনে ৩ শতাংশের বেশি না কমতে পারার সীমা আরোপের পর বাজারে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গত ২৫ এপ্রিল এ সীমা আরোপ করে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
নতুন এই সিদ্ধান্ত ও শেয়ারবাজারের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে, কারণ যখনই বাজারে দরপতন শুরু হয়, তখনই দেখা যাচ্ছে বেশির ভাগ শেয়ার ৩ শতাংশ কম দামে বিক্রির প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে। তাতে ক্রেতাও মিলছে না।
যখন এক সাথে অনেকগুলি কোম্পানি সার্কিটে চলে যায় তখন মানুষের মধ্যে আরও ভীতির সৃষ্টি হচ্ছে। সব মিলিয়ে বাজার একটা চরম খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে আছে।
সার্বিক বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেল পুরো বাজার জুড়ে বাজেট কেন্দ্রিক মানুষের মধ্যে একটা ভিতি কাজ করছে। বাজার সংশ্লিষ্ট সচেতন লোকজন আশা করছেন বাজেট ঘোষণার পরে একটি স্থিতিশীল বাজার দেখতে পাবেন বিনিয়োগকারীরা।